রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
ONE NEWS EXPRESS

অনলাইন জুয়ার কালো থাবা নিঃশেষ তরুণ সমাজ


তৌহিদ হাসান
জামালপুর জেলা প্রতিনিধি , 2 ফলোয়ার
প্রকাশ : শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৯ অপরাহ্ণ | প্রিন্ট | ডাউনলোড কার্ড

অনলাইন জুয়ার কালো থাবা নিঃশেষ তরুণ সমাজ

​রাত তখন পৌনে তিনটা। রাজশাহী শহরের এক মেসে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ফাহিমের (ছদ্মনাম) ঘরের বাতি নেভানো। কিন্তু ঘরের কোণে তার মুখের ওপর লেপ্টে আছে স্মার্টফোনের নীলচে আলো। চোখের নিচে গাঢ় কালি, কপালে জমে থাকা ঘামের ফোঁটা। স্ক্রিনে কয়েক সেকেন্ড ভেসে থেকে মিলিয়ে গেল রক্তবর্ণের দুটি শব্দ—‘ব্যালেন্স শূন্য’।

​মাত্র পাঁচ সেকেন্ডের একটি সিদ্ধান্ত আর স্ক্রিনে আঙুলের একটি ছোঁয়া ফাহিমের অ্যাকাউন্ট থেকে উড়িয়ে নিয়ে গেল পনেরো হাজার টাকা। এই টাকাটি ছিল আগামী মাসের মেসের খরচ এবং অসুস্থ মায়ের ওষুধের জন্য পাঠানো বাবার জমানো টাকা।

​ফাহিমের এই অধঃপতনের গল্পটি শুরু হয়েছিল চার মাস আগে। ভারত-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের দিন ফেসবুকে ভেসে আসা একটি চটকদার বিজ্ঞাপন থেকে—‘মাত্র ১০০ টাকায় ভাগ্য বদলান!’ কৌতুহলবশত ১০০ টাকা জমা দিয়ে প্রথম দিনেই ফাহিম পান এক হাজার টাকা। সেই যে ডোপামিনের জোয়ার মস্তিষ্কে ঢুকেছিল, তা তাকে ধীরে ধীরে এক অদৃশ্য ফাঁদে আটকে ফেলে। টিউশনির টাকা, বন্ধুদের কাছ থেকে ধার, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টার ফি—সব একে একে গিলে খেয়েছে ভার্চুয়াল এই ক্যাসিনো। এখন ফাহিম একা নন; অন্ধকার ঘরে বসে থাকা এক নিঃস্ব তরুণ, যার সামনে কেবল ঋণের বোঝা আর আত্মগ্লানি।

​ফাহিমের এই গল্পটি কেবল একজনের নয়। এটি এখন দেশের হাজারো তরুণ-তরুণীর অলক্ষিত জীবনের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। অনলাইন জুয়া বা ‘ই-গেমিং বেটিং’ এখন আর দূরবর্তী কোনো ক্যাসিনোর বিষয় নয়, এটি সরাসরি ঢুকে পড়েছে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঘরের পড়ার টেবিলে, পকেটের ভেতরে।

​প্রথাগত জুয়ার সঙ্গে অনলাইন জুয়ার মূল পার্থক্য হলো এর মনস্তাত্ত্বিক অ্যালগরিদম। ডিজিটাল এই প্ল্যাটফর্মগুলো তৈরিই করা হয়েছে এমনভাবে, যেন মানুষের মস্তিষ্ককে বিভ্রান্ত করা যায়। শুরুতে অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীকে ছোট ছোট 'জয়' উপহার দেয়, যাতে তার মনে বিশ্বাস জন্মে যে সে বিজয়ী হতে পারে। এরপর যখন হারতে শুরু করে, তখন ‘ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার’ (Loss Chasing) এক অদম্য মানসিক তাড়না তৈরি হয়। মানুষ তখন যুক্তিবোধ হারিয়ে কেবল একটি চাল বা একটি ক্লিকের ওপর ভরসা করে সব ঢেলে দেয়।

​এই অবৈধ ব্যবসার পেছনের অর্থনীতি আরও ভয়াবহ। ডিজিটাল লেনদেনের বিভিন্ন মাধ্যম, অবৈধ এজেন্ট এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির আড়ালে প্রতিনিয়ত দেশ থেকে শত শত কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে দেশের বাইরে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো এর বিপণন কৌশল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার, ছোট ছোট কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং খেলাধুলার ছদ্মবেশী স্পন্সরশিপের মাধ্যমে তরুণদের মস্তিষ্কে এটি ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে এক ধরনের ‘আধুনিক বিনিয়োগ’ বা ‘বিনোদনের’ মোড়কে।

​আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারি থাকলেও অনলাইন ক্যাসিনো বা বেটিং সাইটগুলোর গতিবিধি অত্যন্ত ধূর্ত। একটি ডোমেইন বা অ্যাপ বন্ধ হলে রাতারাতি মিরর সাইট বা নতুন অ্যাপ খুলে ফেলা হয়। ফলে শুধু প্রশাসনিক অভিযান দিয়ে এই সামাজিক ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না।

​পর্দায় ভেসে থাকা কৃত্রিম আলো যখন নিভে যায়, তখন অন্ধকার ঘরে জেগে থাকে কেবল বাস্তবতার নিষ্ঠুর সত্য। ফাহিমদের মতো সম্ভাবনাময় তরুণদের জীবন অ্যালগরিদমের এই নীল আলোয় নিঃশেষ হওয়ার আগেই সামাজিক সচেতনতা, কঠোর প্রযুক্তিগত প্রতিরোধ এবং পারিাবরিক মনিটরিং নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায়, এক ডিজিটাল মোহের আড়ালে হারিয়ে যাবে একটি পুরো প্রজন্মের নীরব মেধা ও ভবিষ্যৎ।

এই সংবাদটি আপনার কেমন লেগেছে?


খবরটি রেটিং দিন

গড় রেটিং: ০/৫ (০ ভোট)

ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

ONE NEWS EXPRESS

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬


অনলাইন জুয়ার কালো থাবা নিঃশেষ তরুণ সমাজ

প্রকাশের তারিখ : শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৯ অপরাহ্ণ

featured Image

​রাত তখন পৌনে তিনটা। রাজশাহী শহরের এক মেসে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ফাহিমের (ছদ্মনাম) ঘরের বাতি নেভানো। কিন্তু ঘরের কোণে তার মুখের ওপর লেপ্টে আছে স্মার্টফোনের নীলচে আলো। চোখের নিচে গাঢ় কালি, কপালে জমে থাকা ঘামের ফোঁটা। স্ক্রিনে কয়েক সেকেন্ড ভেসে থেকে মিলিয়ে গেল রক্তবর্ণের দুটি শব্দ—‘ব্যালেন্স শূন্য’।

​মাত্র পাঁচ সেকেন্ডের একটি সিদ্ধান্ত আর স্ক্রিনে আঙুলের একটি ছোঁয়া ফাহিমের অ্যাকাউন্ট থেকে উড়িয়ে নিয়ে গেল পনেরো হাজার টাকা। এই টাকাটি ছিল আগামী মাসের মেসের খরচ এবং অসুস্থ মায়ের ওষুধের জন্য পাঠানো বাবার জমানো টাকা।

​ফাহিমের এই অধঃপতনের গল্পটি শুরু হয়েছিল চার মাস আগে। ভারত-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের দিন ফেসবুকে ভেসে আসা একটি চটকদার বিজ্ঞাপন থেকে—‘মাত্র ১০০ টাকায় ভাগ্য বদলান!’ কৌতুহলবশত ১০০ টাকা জমা দিয়ে প্রথম দিনেই ফাহিম পান এক হাজার টাকা। সেই যে ডোপামিনের জোয়ার মস্তিষ্কে ঢুকেছিল, তা তাকে ধীরে ধীরে এক অদৃশ্য ফাঁদে আটকে ফেলে। টিউশনির টাকা, বন্ধুদের কাছ থেকে ধার, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টার ফি—সব একে একে গিলে খেয়েছে ভার্চুয়াল এই ক্যাসিনো। এখন ফাহিম একা নন; অন্ধকার ঘরে বসে থাকা এক নিঃস্ব তরুণ, যার সামনে কেবল ঋণের বোঝা আর আত্মগ্লানি।

​ফাহিমের এই গল্পটি কেবল একজনের নয়। এটি এখন দেশের হাজারো তরুণ-তরুণীর অলক্ষিত জীবনের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। অনলাইন জুয়া বা ‘ই-গেমিং বেটিং’ এখন আর দূরবর্তী কোনো ক্যাসিনোর বিষয় নয়, এটি সরাসরি ঢুকে পড়েছে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঘরের পড়ার টেবিলে, পকেটের ভেতরে।

​প্রথাগত জুয়ার সঙ্গে অনলাইন জুয়ার মূল পার্থক্য হলো এর মনস্তাত্ত্বিক অ্যালগরিদম। ডিজিটাল এই প্ল্যাটফর্মগুলো তৈরিই করা হয়েছে এমনভাবে, যেন মানুষের মস্তিষ্ককে বিভ্রান্ত করা যায়। শুরুতে অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীকে ছোট ছোট 'জয়' উপহার দেয়, যাতে তার মনে বিশ্বাস জন্মে যে সে বিজয়ী হতে পারে। এরপর যখন হারতে শুরু করে, তখন ‘ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার’ (Loss Chasing) এক অদম্য মানসিক তাড়না তৈরি হয়। মানুষ তখন যুক্তিবোধ হারিয়ে কেবল একটি চাল বা একটি ক্লিকের ওপর ভরসা করে সব ঢেলে দেয়।

​এই অবৈধ ব্যবসার পেছনের অর্থনীতি আরও ভয়াবহ। ডিজিটাল লেনদেনের বিভিন্ন মাধ্যম, অবৈধ এজেন্ট এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির আড়ালে প্রতিনিয়ত দেশ থেকে শত শত কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে দেশের বাইরে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো এর বিপণন কৌশল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার, ছোট ছোট কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং খেলাধুলার ছদ্মবেশী স্পন্সরশিপের মাধ্যমে তরুণদের মস্তিষ্কে এটি ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে এক ধরনের ‘আধুনিক বিনিয়োগ’ বা ‘বিনোদনের’ মোড়কে।

​আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারি থাকলেও অনলাইন ক্যাসিনো বা বেটিং সাইটগুলোর গতিবিধি অত্যন্ত ধূর্ত। একটি ডোমেইন বা অ্যাপ বন্ধ হলে রাতারাতি মিরর সাইট বা নতুন অ্যাপ খুলে ফেলা হয়। ফলে শুধু প্রশাসনিক অভিযান দিয়ে এই সামাজিক ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না।

​পর্দায় ভেসে থাকা কৃত্রিম আলো যখন নিভে যায়, তখন অন্ধকার ঘরে জেগে থাকে কেবল বাস্তবতার নিষ্ঠুর সত্য। ফাহিমদের মতো সম্ভাবনাময় তরুণদের জীবন অ্যালগরিদমের এই নীল আলোয় নিঃশেষ হওয়ার আগেই সামাজিক সচেতনতা, কঠোর প্রযুক্তিগত প্রতিরোধ এবং পারিাবরিক মনিটরিং নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায়, এক ডিজিটাল মোহের আড়ালে হারিয়ে যাবে একটি পুরো প্রজন্মের নীরব মেধা ও ভবিষ্যৎ।


ONE NEWS EXPRESS

সম্পাদক ও প্রকাশক- মো: মনিরুজ্জামান
সহ-সম্পাদক: তুহিন আহসান
বার্তা সম্পাদক: তামিমা জান্নাত
চেয়ারম্যান- মো: এনায়েত হোসেন
ম্যানেজিং ডিরেক্টর- মো: মনিরুজ্জামান
প্রধান সম্পাদক:
নির্বাহী সম্পাদক-
বার্তা সম্পাদক-

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
অনলাইন জুয়ার কালো থাবা নিঃশেষ তরুণ সমাজ
0:00 / 0:00
1x