রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
ONE NEWS EXPRESS

ফিচার

অবলা প্রাণীদের ওপর নৃশংসতা

​আমরা নিজেদের ‘শ্রেষ্ঠ জীব’ বা আশরাফুল মাখলুকাত বলে দাবি করি। কিন্তু আমাদের চারপাশে চোখ মেলালে কি সেই শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ মেলে? ফুটপাতে আশ্রয় নেওয়া একটি আশ্রয়হীন কুকুর, খাবার না পেয়ে ডেকে ওঠা একটি বিড়াল, কিংবা একটু বিশ্রামের খোঁজে ডালপালায় বসে থাকা কোনো পাখি—এই অবলা প্রাণীগুলো কি আমাদের সমাজে নিরাপদ? সম্প্রতি প্রায়শই খবরে আসছে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে অসহায় প্রাণীদের ওপর নানাবিধ নৃশংস নির্যাতনের ঘটনা। এদের লাঠি দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা, গায়ে বিষ ঢেলে দেওয়া বা গায়ের জোরে যন্ত্রণাদায়ক অঙ্গহানি করার মতো ঘটনাগুলো কোনো স্বাভাবিক সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের কাজ হতে পারে না।​এ প্রশ্ন এখন উচ্চরবে তোলার সময় এসেছে—আমরা কি অবলা ও অসহায় প্রাণীদের প্রতি একটুখানি মানবিক হতে পারি না?​মনোবিজ্ঞানীদের মতে, যারা আত্মরক্ষা করতে অক্ষম বা অবলা প্রাণীদের ওপর শক্তি প্রদর্শন ও নির্যাতন চালায়, তারা মূলত গভীর মানসিক বিকৃতি ও হীনমন্যতায় ভুগছে। দুর্বল ও নির্বাক প্রাণীর ওপর নিপীড়ন চালানোর মধ্যে কোনো বীরত্ব নেই, বরং তা চরম মানসিক অস্থিরতা এবং অপরাধপ্রবণতার বাহ্যিক প্রকাশ।​গবেষণায় দেখা গেছে, ছোটবেলায় বা স্বাভাবিক জীবনে প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করার মানসিকতা পরবর্তীতে মানবসমাজ ও মানুষের ওপর হিংস্র অপরাধে রূপ নেয়। তাই প্রাণীদের ওপর যারা হামলা চালায়, তারা শুধু সমাজের জন্য নয়, পুরো মানবজাতির সুরক্ষার জন্যই এক অদৃশ্য হুমকি। এ ধরনের মানসিক বিকৃতিকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।বাংলাদেশে ‘প্রাণী কল্যাণ আইন, ২০১৯’ চালু থাকলেও এর কার্যকারিতা ও প্রয়োগ বাস্তবে বহুলাংশে সীমিত। উপযুক্ত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে অপরাধীরা বারবার অপরাধ করতে সাহস পায়। অনেক সময় এসব নৃশংসতাকে ‘তুচ্ছ বিষয়’ বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।​পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং মূক ও অবলা প্রাণীদের জীবনের নিরাপত্তা দিতে হলে—১. আইনের কঠোর ও দ্রুত প্রয়োগ: প্রাণীর ওপর যেকোনো হামলা, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনতে হবে।২. দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: অবলা প্রাণীকে হত্যার বিচার যেন কেবল নামমাত্র জরিমানায় সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং দৃষ্টান্তমূলক কারাদণ্ডের বিধান বাস্তবে রূপ দিতে হবে।৩. ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা: বিভিন্ন স্থান ও মোড়ে প্রাণীদের ওপর সংঘটিত সহিংসতার খবর পেলেই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়াতে হবে।​সৃষ্টিকর্তার এই সুন্দর ধরায় শুধু মানুষের একা বাঁচার অধিকার নেই; পশুপাখিসহ প্রতিটি জীবের এ পৃথিবীতে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। একটু ভালোবাসা, খানিকটা উচ্ছিষ্ট খাবার বা সামান্য আশ্রয় পেলে এরা আমাদের নিঃস্বার্থ অনুগত হয়ে ওঠে।আমরা যদি সত্যিই একটি সভ্য ও মানবিক সমাজ গড়তে চাই, তবে আমাদের চিন্তাধারায় পরিবর্তন আনতে হবে:​পারিবারিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ: ছোটবেলা থেকেই শিশুদের পশুপাখির প্রতি ভালোবাসা ও যত্ন নেওয়ার শিক্ষা দিন।সামাজিক সচেতনতা: এলাকাভিত্তিক প্রাণীদের সুরক্ষায় তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে। নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।​প্রাণী উদ্ধার ও চিকিৎসা: অসুস্থ ও আহত প্রাণীদের উদ্ধার ও চিকিৎসার জন্য সামাজিক ও সরকারী উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।যে সমাজ অবলা, নির্বাক ও অসহায় প্রাণীদের সুরক্ষা দিতে পারে না, সে সমাজ কখনোই নিজেদের পুরোপুরি সভ্য বলে দাবি করতে পারে না। আসুন, আমরা মানসিক বিকৃতি ও নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হই। অসহায় প্রাণীদের ওপর নির্যাতনকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করি এবং হৃদয়ে একটুখানি ভালোবাসা ও মানবিকতা পুষে এই সুন্দর পৃথিবীকে সব জীবের জন্য বাসযোগ্য করে তুলি।

অবলা প্রাণীদের ওপর নৃশংসতা