রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
ONE NEWS EXPRESS

রাজধানীর মিরপুর এখন আতঙ্কের জনপদ


মোঃ বাবুল হোসেন
ক্রাইম রিপোর্টার , 0 ফলোয়ার
প্রকাশ : সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪৭ অপরাহ্ণ | প্রিন্ট | ডাউনলোড কার্ড

রাজধানীর মিরপুর এখন আতঙ্কের জনপদ
ছবি সংগৃহীত

মোহাম্মদপুর, আদাবরের পর এবার অপরাধের নতুন স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে রাজধানীর মিরপুর এলাকা। বিগত কয়েক মাসের অবাধ চুরি, ছিনতাই, হত্যা, সংঘবদ্ধ ডাকাতিসহ নানা অপরাধের কারণে সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র আতঙ্ক। মিরপুর এখন পরিণত হয়েছে ‘আতঙ্কের জনপদে’।

ভাষানটেক, কাফরুলসহ মিরপুরের আশপাশের এলাকাগুলোতে দিনদিন বাড়ছে কিশোর গ্যাংসহ বিভিন্ন অপরাধী চক্রের দাপট। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বাড়ানো হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা। তবে ধারাবাহিক অভিযান, গ্রেপ্তারসহ নানা পদক্ষেপের পরও দমছে না লাগামহীন অপরাধ। ফলে স্থানীয়দের প্রতি মুহূর্তের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র ভয় ও আতঙ্ক। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কাটছে তাদের দিন-রাত।

রূপনগর এলাকার এক ব্যবসায়ী ভিওডি বাংলাকে বলেন, আগে রাত ১২টা-১টায় দোকান বন্ধ করে বাসায় ফিরতাম কোনো ভয় ছাড়াই। এখন রাত ৯টা বাজলেই রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়, আতঙ্কে দোকান বন্ধ করে দিতে হয়।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর জোনের বিভিন্ন থানা সূত্রে জানা গেছে, অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে চিরুনি অভিযান চালিয়ে ছিনতাই ও ডাকাতির সাথে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগেও মিরপুর বিভাগের বিভিন্ন থানা এলাকা থেকে সন্দেহভাজন অপরাধীদের নিয়মিত আইনের আওতায় আনা হয়েছে।

ডিএমপির মিরপুর জোনের এক কর্মকর্তা জানান, অপরাধীদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা জোরদারে প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে পুলিশের টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি দ্বিগুণ করা হয়েছে। যেকোনো মূল্যে মিরপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যাপারে প্রশাসন বদ্ধপরিকর।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অপরাধ পরিসংখ্যান বলছে, অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত তেজগাঁও বিভাগের তুলনায় গত কয়েক মাসে মিরপুর বিভাগে খুন, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

সুত্রমতে, জুনের প্রথমদিকে মিরপুর ১০ নম্বরের ‘এ’ ব্লকের ২০ নম্বর লাইনে এক রাতে এক যোগে ছয়টি দোকান ও বাসায় হানা দেয় একদল সংঘবদ্ধ ডাকাত। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ভোর ৪টা ২০ মিনিটে একটি সাদা প্রাইভেটকার এসে রাস্তার পাশে থামে। গাড়ি থেকে মুখ ঢাকা তিন ব্যক্তি নেমে ‘মা মনি’ স্টোর নামে একটি মুদি দোকানের তালা কাটে। এরপর একে একে লাইনের আরও ৫টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ভবনের নিচের গেট কেটে ভেতরে প্রবেশ করে তারা নগদ টাকা, মূল্যবান সামগ্রী ও মালামাল লুট করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়।

ওই ঘটনার পর তিন মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো সুরাহা হয়নি। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সিসিটিভি ফুটেজ থাকার পরও মালামাল উদ্ধার হয়নি। আইনের আওতায় আসেনি জড়িতরাও। তাদের অভিযোগ, এখন ডাকাতি শুধু রাতের আঁধারেই নয়, মিরপুরের অলিগলিতে দিনদুপুরেও চলছে অস্ত্রের মহড়া ও গোলাগুলি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিরপুর, পল্লবী, রূপনগর, ভাষানটেক, কাফরুল এবং কালশী এলাকায় ডজন খানেক কিশোর গ্যাং ব্যাপকভাবে সক্রিয়। সন্ধ্যা নামলেই স্কুল-কলেজের সামনে এবং অন্ধকার গলিতে এদের আড্ডা বসে। পথচারী, স্কুলগামী শিক্ষার্থী কিংবা অফিস ফেরত মানুষদের আটকে মোবাইল ও টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেওয়া এদের নিত্যদিনের কাজ। বাধা দিলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করতেও দ্বিধা করছে না তারা।

ভুক্তভোগীরা জানান, এসব কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্যে স্থানীয় কিছু গডফাদার ও প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষক রয়েছেন। এ কারণে গ্রেপ্তার হলেও তারা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও একই অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকার পতনের পর পুলিশের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে এলাকাগুলোতে অপরাধীরা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। 

এদিকে পুলিশি অভিযান থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মন থেকে ভয় কাটছে না। রূপনগর ও মিরপুর-২ নম্বরের ব্যবসায়ীরা জানান, আগে যেখানে রাত ১২টা বা ১টা পর্যন্ত নিশ্চিন্তে ব্যবসা করা যেত, এখন রাত ৯টা বাজলেই চারদিক থমথমে হয়ে যায়। রিকশাচালক ও সাধারণ চাকরিজীবীরা রাতে মিরপুরের প্রধান সড়ক ছাড়া ভেতরের গলিগুলো দিয়ে যাতায়াত করতে ভয় পান।

ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোস্তাক সরকার বলেন, মিরপুরবাসীকে নিরাপদ রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। প্রতিটি ব্লকে পুলিশের টহল এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি দ্বিগুণ করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধীদের আস্তানাগুলোতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। কোনো গডফাদারকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

ভুক্তভোগীদের চোখে বর্তমান মিরপুর

ডাকাতির শিকার হওয়া মিরপুর ১০ নম্বরের ‘মা মনি’ স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. শামসুল হক তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ২৫ বছর ধরে এই এলাকায় ব্যবসা করছি, কিন্তু এমন অস্থিরতা আগে কখনো দেখিনি। চোখের সামনে কলাপসিবল গেটের তালা কেটে হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকল ডাকাতরা। ক্যাশবাক্সে থাকা ব্যবসার পুঁজি আর জরুরি সব মালামাল পলকেই শেষ করে দিলো। আমরা এখন দোকানে বসতেও ভয় পাচ্ছি। সিসিটিভি ফুটেজ পুলিশকে দিয়েছি, কিন্তু এখনো কোনো কূলকিনারা হয়নি। রাতে ঘুমাতে পারি না, কখন যে আবার সব হারাই এই আতঙ্কে থাকি।

কিছুদিন আগেই ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন চাকরিজীবী ও পল্লবীর বাসিন্দা ফারহানা ইয়াসমিন। তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে মাগরিবের পর অফিস থেকে বাসায় ফিরছিলাম। প্রধান সড়ক থেকে গলির মোড়ে ঢুকতেই তিনটা ছেলে ধারালো ছুরি দেখিয়ে আমার ব্যাগ আর মোবাইল কেড়ে নেয়। আমি চিৎকার করার চেষ্টা করলে একজন সরাসরি গলায় ছুরি ঠেকিয়ে বলে, 'চুপ থাক, নয়তো এখানেই শেষ করে দেব।'

ফারহানা আরও বলেন, ওই ঘটনার পর থেকে আমার একা রাস্তায় বের হতেও হাত-পা কাঁপে। মিরপুর এখন আর আমাদের জন্য নিরাপদ নয়।

অতিসম্প্রতি মিরপুর-১১ এবং পল্লবীর বিহারি ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায় মাদকের কারবার ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে প্রকাশ্য দিবালোকে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে নারীসহ দুইজন গুলিবিদ্ধ হন। এ ধরনের আকস্মিক সহিংসতায় সাধারণ পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দারা চরম হুমকির মুখে পড়েছেন।

এ বিষয়ে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) মিরপুর বিভাগের  উপ-কমিশনার (ডিসি) রাকিব খানের সাথে যোগাযোগ করে ভিওডি বাংলা। তিনি বলেন, চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাইকারী, কিশোর গ্যাং ও গডফাদার যে-ই হোক না কেন তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। অপরাধী যে দলেরই হোক তার পরিচয় শুধুই অপরাধী। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলবে। মিরপুরে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছি। মিরপুর বিভাগের অপরাধ জিরো টলারেন্সে নামিয়ে আনতে আমরা বদ্ধপরিকর।

ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোস্তাক সরকার ভিওডি বাংলাকে বলেন, মিরপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় উন্নতির দিকে। চুরি, ছিনতাই বা মাদক বিক্রি আগের তুলনায় কম।

মাদকের বিষয়ে তিনি বলেন, শুধু মিরপুরেই ৩৯টি বিহারী ক্যাম্প আছে। অনেকে বিভিন্ন এলাকা থেকে মাদক সেবন করতে এই ক্যাম্পের মাদক স্পটগুলোতে আসে। প্রতি মাসে দেড় থেকে দুই হাজার মাদক সেবনকারীকে এসব স্পট থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। আমি মিরপুর বিভাগের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিভিন্ন অপরাধ জিরো টলারেন্সে নামিয়ে আনতে কাজ করছি।

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে ডিসি মোস্তাক বলেন, মিরপুরে সক্রিয় কিশোর গ্যাং আছে। এ পর্যন্ত শুধু ‘আসিফ গ্রুপ’ ও ‘ভইরা দে গ্রুপের’ প্রায় ৩০ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া ‘বাহুবলি গ্রুপ’ নামে আরেকটি কিশোর গ্যাং নিয়ে কাজ করছে পুলিশ। অতীতের কোনো কিছুর তুলনায় বা ২০২৪ সালের  ৫ আগস্ট পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে উন্নত।

এই সংবাদটি আপনার কেমন লেগেছে?


খবরটি রেটিং দিন

গড় রেটিং: ০/৫ (০ ভোট)

ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

ONE NEWS EXPRESS

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬


রাজধানীর মিরপুর এখন আতঙ্কের জনপদ

প্রকাশের তারিখ : সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪৭ অপরাহ্ণ

featured Image

মোহাম্মদপুর, আদাবরের পর এবার অপরাধের নতুন স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে রাজধানীর মিরপুর এলাকা। বিগত কয়েক মাসের অবাধ চুরি, ছিনতাই, হত্যা, সংঘবদ্ধ ডাকাতিসহ নানা অপরাধের কারণে সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র আতঙ্ক। মিরপুর এখন পরিণত হয়েছে ‘আতঙ্কের জনপদে’।

ভাষানটেক, কাফরুলসহ মিরপুরের আশপাশের এলাকাগুলোতে দিনদিন বাড়ছে কিশোর গ্যাংসহ বিভিন্ন অপরাধী চক্রের দাপট। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বাড়ানো হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা। তবে ধারাবাহিক অভিযান, গ্রেপ্তারসহ নানা পদক্ষেপের পরও দমছে না লাগামহীন অপরাধ। ফলে স্থানীয়দের প্রতি মুহূর্তের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র ভয় ও আতঙ্ক। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কাটছে তাদের দিন-রাত।

রূপনগর এলাকার এক ব্যবসায়ী ভিওডি বাংলাকে বলেন, আগে রাত ১২টা-১টায় দোকান বন্ধ করে বাসায় ফিরতাম কোনো ভয় ছাড়াই। এখন রাত ৯টা বাজলেই রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়, আতঙ্কে দোকান বন্ধ করে দিতে হয়।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর জোনের বিভিন্ন থানা সূত্রে জানা গেছে, অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে চিরুনি অভিযান চালিয়ে ছিনতাই ও ডাকাতির সাথে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগেও মিরপুর বিভাগের বিভিন্ন থানা এলাকা থেকে সন্দেহভাজন অপরাধীদের নিয়মিত আইনের আওতায় আনা হয়েছে।

ডিএমপির মিরপুর জোনের এক কর্মকর্তা জানান, অপরাধীদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা জোরদারে প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে পুলিশের টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি দ্বিগুণ করা হয়েছে। যেকোনো মূল্যে মিরপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যাপারে প্রশাসন বদ্ধপরিকর।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অপরাধ পরিসংখ্যান বলছে, অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত তেজগাঁও বিভাগের তুলনায় গত কয়েক মাসে মিরপুর বিভাগে খুন, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

সুত্রমতে, জুনের প্রথমদিকে মিরপুর ১০ নম্বরের ‘এ’ ব্লকের ২০ নম্বর লাইনে এক রাতে এক যোগে ছয়টি দোকান ও বাসায় হানা দেয় একদল সংঘবদ্ধ ডাকাত। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ভোর ৪টা ২০ মিনিটে একটি সাদা প্রাইভেটকার এসে রাস্তার পাশে থামে। গাড়ি থেকে মুখ ঢাকা তিন ব্যক্তি নেমে ‘মা মনি’ স্টোর নামে একটি মুদি দোকানের তালা কাটে। এরপর একে একে লাইনের আরও ৫টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ভবনের নিচের গেট কেটে ভেতরে প্রবেশ করে তারা নগদ টাকা, মূল্যবান সামগ্রী ও মালামাল লুট করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়।

ওই ঘটনার পর তিন মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো সুরাহা হয়নি। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সিসিটিভি ফুটেজ থাকার পরও মালামাল উদ্ধার হয়নি। আইনের আওতায় আসেনি জড়িতরাও। তাদের অভিযোগ, এখন ডাকাতি শুধু রাতের আঁধারেই নয়, মিরপুরের অলিগলিতে দিনদুপুরেও চলছে অস্ত্রের মহড়া ও গোলাগুলি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিরপুর, পল্লবী, রূপনগর, ভাষানটেক, কাফরুল এবং কালশী এলাকায় ডজন খানেক কিশোর গ্যাং ব্যাপকভাবে সক্রিয়। সন্ধ্যা নামলেই স্কুল-কলেজের সামনে এবং অন্ধকার গলিতে এদের আড্ডা বসে। পথচারী, স্কুলগামী শিক্ষার্থী কিংবা অফিস ফেরত মানুষদের আটকে মোবাইল ও টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেওয়া এদের নিত্যদিনের কাজ। বাধা দিলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করতেও দ্বিধা করছে না তারা।

ভুক্তভোগীরা জানান, এসব কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্যে স্থানীয় কিছু গডফাদার ও প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষক রয়েছেন। এ কারণে গ্রেপ্তার হলেও তারা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও একই অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকার পতনের পর পুলিশের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে এলাকাগুলোতে অপরাধীরা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। 

এদিকে পুলিশি অভিযান থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মন থেকে ভয় কাটছে না। রূপনগর ও মিরপুর-২ নম্বরের ব্যবসায়ীরা জানান, আগে যেখানে রাত ১২টা বা ১টা পর্যন্ত নিশ্চিন্তে ব্যবসা করা যেত, এখন রাত ৯টা বাজলেই চারদিক থমথমে হয়ে যায়। রিকশাচালক ও সাধারণ চাকরিজীবীরা রাতে মিরপুরের প্রধান সড়ক ছাড়া ভেতরের গলিগুলো দিয়ে যাতায়াত করতে ভয় পান।

ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোস্তাক সরকার বলেন, মিরপুরবাসীকে নিরাপদ রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। প্রতিটি ব্লকে পুলিশের টহল এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি দ্বিগুণ করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধীদের আস্তানাগুলোতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। কোনো গডফাদারকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

ভুক্তভোগীদের চোখে বর্তমান মিরপুর

ডাকাতির শিকার হওয়া মিরপুর ১০ নম্বরের ‘মা মনি’ স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. শামসুল হক তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ২৫ বছর ধরে এই এলাকায় ব্যবসা করছি, কিন্তু এমন অস্থিরতা আগে কখনো দেখিনি। চোখের সামনে কলাপসিবল গেটের তালা কেটে হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকল ডাকাতরা। ক্যাশবাক্সে থাকা ব্যবসার পুঁজি আর জরুরি সব মালামাল পলকেই শেষ করে দিলো। আমরা এখন দোকানে বসতেও ভয় পাচ্ছি। সিসিটিভি ফুটেজ পুলিশকে দিয়েছি, কিন্তু এখনো কোনো কূলকিনারা হয়নি। রাতে ঘুমাতে পারি না, কখন যে আবার সব হারাই এই আতঙ্কে থাকি।

কিছুদিন আগেই ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন চাকরিজীবী ও পল্লবীর বাসিন্দা ফারহানা ইয়াসমিন। তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে মাগরিবের পর অফিস থেকে বাসায় ফিরছিলাম। প্রধান সড়ক থেকে গলির মোড়ে ঢুকতেই তিনটা ছেলে ধারালো ছুরি দেখিয়ে আমার ব্যাগ আর মোবাইল কেড়ে নেয়। আমি চিৎকার করার চেষ্টা করলে একজন সরাসরি গলায় ছুরি ঠেকিয়ে বলে, 'চুপ থাক, নয়তো এখানেই শেষ করে দেব।'

ফারহানা আরও বলেন, ওই ঘটনার পর থেকে আমার একা রাস্তায় বের হতেও হাত-পা কাঁপে। মিরপুর এখন আর আমাদের জন্য নিরাপদ নয়।

অতিসম্প্রতি মিরপুর-১১ এবং পল্লবীর বিহারি ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায় মাদকের কারবার ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে প্রকাশ্য দিবালোকে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে নারীসহ দুইজন গুলিবিদ্ধ হন। এ ধরনের আকস্মিক সহিংসতায় সাধারণ পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দারা চরম হুমকির মুখে পড়েছেন।

এ বিষয়ে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) মিরপুর বিভাগের  উপ-কমিশনার (ডিসি) রাকিব খানের সাথে যোগাযোগ করে ভিওডি বাংলা। তিনি বলেন, চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাইকারী, কিশোর গ্যাং ও গডফাদার যে-ই হোক না কেন তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। অপরাধী যে দলেরই হোক তার পরিচয় শুধুই অপরাধী। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলবে। মিরপুরে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছি। মিরপুর বিভাগের অপরাধ জিরো টলারেন্সে নামিয়ে আনতে আমরা বদ্ধপরিকর।

ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোস্তাক সরকার ভিওডি বাংলাকে বলেন, মিরপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় উন্নতির দিকে। চুরি, ছিনতাই বা মাদক বিক্রি আগের তুলনায় কম।

মাদকের বিষয়ে তিনি বলেন, শুধু মিরপুরেই ৩৯টি বিহারী ক্যাম্প আছে। অনেকে বিভিন্ন এলাকা থেকে মাদক সেবন করতে এই ক্যাম্পের মাদক স্পটগুলোতে আসে। প্রতি মাসে দেড় থেকে দুই হাজার মাদক সেবনকারীকে এসব স্পট থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। আমি মিরপুর বিভাগের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিভিন্ন অপরাধ জিরো টলারেন্সে নামিয়ে আনতে কাজ করছি।

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে ডিসি মোস্তাক বলেন, মিরপুরে সক্রিয় কিশোর গ্যাং আছে। এ পর্যন্ত শুধু ‘আসিফ গ্রুপ’ ও ‘ভইরা দে গ্রুপের’ প্রায় ৩০ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া ‘বাহুবলি গ্রুপ’ নামে আরেকটি কিশোর গ্যাং নিয়ে কাজ করছে পুলিশ। অতীতের কোনো কিছুর তুলনায় বা ২০২৪ সালের  ৫ আগস্ট পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে উন্নত।


ONE NEWS EXPRESS

সম্পাদক ও প্রকাশক- মো: মনিরুজ্জামান
সহ-সম্পাদক: তুহিন আহসান
বার্তা সম্পাদক: তামিমা জান্নাত
চেয়ারম্যান- মো: এনায়েত হোসেন
ম্যানেজিং ডিরেক্টর- মো: মনিরুজ্জামান
প্রধান সম্পাদক:
নির্বাহী সম্পাদক-
বার্তা সম্পাদক-

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
রাজধানীর মিরপুর এখন আতঙ্কের জনপদ
0:00 / 0:00
1x