জীবনের কিছু গল্প সংবাদ হয় না, কোনো থানায় তার জিডি হয় না, আদালতের কোনো নথিতে তার হিসাব লেখা থাকে না। অথচ সেই গল্পগুলোই কখনো কখনো একজন মানুষের বুকের ভেতর সবচেয়ে দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেঁচে থাকে। এমনই একটি গল্প একটি পুরোনো বাড়ির। বাড়িটিতে একসময় অনেকগুলো কণ্ঠ ছিল, হাসি ছিল, অভিমান ছিল, ছোটদের দৌড়ঝাঁপ ছিল, মায়ের ডাক ছিল, বাবার শাসন ছিল। একই উঠোনে ভাই-বোনেরা বড় হয়েছে। একজনের কষ্টে অন্যজন কেঁদেছে, একজনের আনন্দে অন্যজন হেসেছে। তখন কেউ ভাবেনি—একদিন এই বাড়ির প্রতিটি ইঞ্চি জায়গা, প্রতিটি ঘর, প্রতিটি স্মৃতি হিসাবের খাতায় উঠবে। কারণ শৈশবে মানুষ সম্পত্তির হিসাব বোঝে না, বোঝে শুধু মায়ের আঁচল আর বাবার হাত।
এই পরিবারের বড় সন্তানটি খুব ছোট বয়স থেকেই বুঝেছিল দায়িত্ব কী জিনিস। মায়ের অসুস্থতার কারণে ছোট ভাইদের কোলে-পিঠে করে বড় করেছে। তাদের ক্ষুধা, পড়াশোনা, প্রয়োজন—সবকিছুকে নিজের প্রয়োজনের আগে রেখেছে। চাকরি জীবনের দীর্ঘ ষোলো বছর সে কী আয় করেছে, কতটা নিজের জন্য রেখেছে আর কতটা পরিবারের জন্য দিয়েছে—তার কোনো খাতা সে রাখেনি। কারণ কিছু মানুষ পরিবারের জন্য কাজ করার সময় হিসাব করে না। তারা ভাবে—আজ ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার প্রয়োজন, কাল তার ভবিষ্যৎ হবে; আজ সংসারে টাকা দরকার, কাল পরিস্থিতি ভালো হবে; আজ নিজের ইচ্ছেটা বাদ দিলাম, একদিন সবাই মিলে ভালো থাকব। এটাই ছিল তার ভালোবাসা।
কখনো ভাবেনি, একদিন সেই ত্যাগের হিসাব কাউকে বলতে হবে। কারণ সে বিশ্বাস করেছিল, ভাইকে সাহায্য করলে তার কাছে হিসাব রাখতে হয় না, পরিবারের জন্য করলে কৃতিত্ব চাইতে হয় না, ছোটদের মানুষ করলে একদিন তারা বড় হয়ে বুঝবে—এই আশাটুকুই যথেষ্ট। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা হলো, যে ত্যাগ আমরা ভালোবাসা দিয়ে করি, তার স্মৃতি অন্যের হৃদয়ে একইভাবে বেঁচে থাকবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
সময় চলে যায়। ছোটরা বড় হয়। যে ভাই একসময় বড় ভাইয়ের হাত ধরে হাঁটত, একদিন সে নিজের পথ খুঁজে নেয়। যে বোন একসময় একই উঠোনে খেলত, একদিন তার নিজের সংসার হয়। তারপর ধীরে ধীরে একই পরিবারের মানুষদের মধ্যেও তৈরি হয় অদৃশ্য দেয়াল। কেউ সেই দেয়াল দেখে না, কিন্তু সবাই তার ঠান্ডা স্পর্শ অনুভব করে।
এরই মধ্যে একদিন বাবা চলে যান। মৃত্যুর সময় পাশে থাকতে না-পারা সন্তানের কষ্ট পৃথিবীর সবচেয়ে নীরব কষ্টগুলোর একটি। মানুষ তখন নিজেকেই প্রশ্ন করে—আরেকটু আগে যদি যেতে পারতাম, আরেকবার যদি বাবার হাতটা ধরতে পারতাম! কিন্তু মৃত্যু কাউকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয় না। তবুও বাবারা চলে যাওয়ার আগে কিছু কথা রেখে যান—যেগুলো কখনো কখনো সম্পদের চেয়েও বড় উত্তরাধিকার হয়ে দাঁড়ায়।
সেই বাবাও তাঁর সন্তানদের সামনে শেষ সময়ে বলে গিয়েছিলেন—মা যতদিন বেঁচে থাকবেন, তাঁর প্রয়োজনের অর্থে যেন কেউ হাত না বাড়ায়; মাকে যেন দেখা হয়, তাঁর শেষ দিনগুলো যেন নিরাপদ ও সম্মানের হয়; ছোট সন্তানটির দিকেও যেন বড় ভাইয়ের দায়িত্ব থাকে। বাবা হয়তো জানতেন না, তাঁর চলে যাওয়ার পর তাঁর এই কথাগুলোই একদিন সন্তানদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।
বাবা চলে গেলেন। বড় ভাইয়েরাও একে একে চলে গেলেন। রয়ে গেলেন মা। আর রয়ে গেল বাবার ভিটেবাড়ি, কিছু সম্পদ, কিছু স্মৃতি এবং অনেকগুলো সম্পর্ক। তারপর শুরু হলো হিসাব—কে কত পাবে, কে কতটুকু পাবে, কার অধিকার কতটুকু, কার কথা ঠিক, কার কথা ভুল। অথচ সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি যেন কোথাও হারিয়ে গেল—মা কতদিন আছেন?
আমরা কি কখনো ভাবি, সম্পত্তির কাগজ নিয়ে যে মানুষগুলো আজ তর্ক করছে, সেই কাগজগুলো একদিন থাকবে; কিন্তু যার জন্য এত হিসাব, সেই মানুষটি হয়তো থাকবে না? মায়ের হাতে থাকা অর্থ নিয়ে যদি সন্তানদের মধ্যে হিসাব শুরু হয়, তাহলে কি সেই অর্থের মূল্য সত্যিই থাকে? একজন মা তাঁর সন্তানদের জন্ম দেন ভাগাভাগির জন্য নয়, একসঙ্গে থাকার জন্য। তিনি চান না, তাঁর জীবনের শেষ বিকেলে সন্তানরা তাঁর সম্পদের হিসাব করুক। তিনি চান, তাঁর সন্তানদের মুখগুলো একসঙ্গে দেখতে।কিন্তু আমরা অনেক সময় মায়ের জীবনের শেষ বিকেলটুকুও হিসাবের খাতায় পরিণত করি। এটাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় বেদনা।
যে বড় ভাইটি একসময় ছোট ভাইদের মানুষ করার জন্য নিজের জীবনের ষোলোটি বছর পার করে দিল, সে আজও কোনো সম্পত্তির মালিক হতে চায় না। তার একমাত্র ইচ্ছা—মা যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন বাবার ভিটেবাড়িতে থেকে মায়ের পাশে থাকা। কারণ তার কাছে সেই বাড়ি কোনো জমি নয়; সেটি বাবার কণ্ঠের প্রতিধ্বনি, মায়ের ভালোবাসার ঘ্রাণ, শৈশবের উঠোন, ভাই-বোনের একসঙ্গে বড় হয়ে ওঠার স্মৃতি।
সেই মানুষটি জানে, একদিন মা-ও চলে যাবেন। তারপর হয়তো সেই বাড়ির প্রতিটি দেয়ালই তার কাছে অসহ্য হয়ে উঠবে। হয়তো তখন সে কোনো দাবি নিয়ে দাঁড়াবে না, কোনো সম্পত্তির জন্য লড়বে না। হয়তো একদিন সত্যিই বলবে—“যতদূর চোখ যায়, আমি চলে যাব। সঙ্গে নেব শুধু বাবা-মায়ের স্মৃতি।”
এ কি পরাজয়? না। কখনো কখনো সরে যাওয়া পরাজয় নয়; বরং সম্পর্কের শেষ অবশিষ্ট সম্মানটুকু বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা।কারও সম্পদ না নিয়েও মানুষ ধনী হতে পারে। কারও সম্পত্তির উত্তরাধিকারী না হয়েও মানুষ তার বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার বহন করতে পারে। সেই উত্তরাধিকার হলো—ভালোবাসা, দায়িত্ব, ক্ষমা এবং মানুষের প্রতি সম্মান।
আজকের সমাজে আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো অর্থের অভাব নয়; আমাদের সংকট হলো অর্থের কাছে সম্পর্কের পরাজয়। এক ভাই আরেক ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে না, কারণ জমির সীমানা কয়েক হাত এদিক-ওদিক। এক বোন ভাইয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, কারণ সম্পত্তির হিসাব তার মনমতো হয়নি। সন্তান মায়ের দিকে তাকানোর আগে হিসাব করে—মায়ের কাছে কী আছে। আর বাবা-মা জীবিত থাকা অবস্থাতেই সন্তানরা তাঁদের মৃত্যুর পরের সম্পদের হিসাব শুরু করে।
আমরা কি ভুলে যাচ্ছি—একদিন আমরাও বৃদ্ধ হব?একদিন আমাদেরও হয়তো একটি সন্তান আমাদের দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে, আমরা তার কাছে মানুষ নাকি শুধু একটি দায়িত্ব। সেদিন যেন আমাদের সন্তানরা আমাদের সম্পদের জন্য নয়, আমাদের ভালোবাসার জন্য পাশে দাঁড়ায়—এই শিক্ষা আজ থেকেই দিতে হবে।কারণ সন্তানকে সম্পত্তি দিয়ে বড় করা যায়, কিন্তু মানুষ করতে হলে মূল্যবোধ দিতে হয়।
একজন বড় ভাইয়ের ষোলো বছরের ত্যাগ হয়তো কোনো দলিলে লেখা থাকবে না। সে কত রাত পরিবারের চিন্তায় ঘুমাতে পারেনি, কত নিজের প্রয়োজন বাদ দিয়েছে, কতবার ছোট ভাইয়ের প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজনের ওপরে রেখেছে—এসবের কোনো উত্তরাধিকার সনদ নেই। কিন্তু মানুষের বিবেকের আদালতে এসবের মূল্য আছে। সেই আদালতের বিচারক কোনো মানুষ নয়—সময়। সময় একদিন সব হিসাব বুঝিয়ে দেয়।তখন হয়তো কেউ বুঝবে—যে মানুষটিকে অবহেলা করেছিলাম, সে আসলে আমাদের শত্রু ছিল না। সে ছিল সেই মানুষটি, যে একসময় আমাদের জন্য নিজের জীবন থেকে অনেকটা সময় নিঃশব্দে দিয়ে দিয়েছিল। তখন হয়তো মনে পড়বে—একসময় আমরা সবাই একই মায়ের সন্তান ছিলাম, একই বাবার হাত ধরে বড় হয়েছিলাম, একই উঠোনে খেলেছিলাম, একই থালার ভাত ভাগ করে খেয়েছিলাম।
তাহলে আজ কেন একটি জমির টুকরো আমাদের সম্পর্কের চেয়ে বড় হবে? কেন বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ বাবার রেখে যাওয়া ভালোবাসার চেয়ে বড় হবে? কেন মায়ের জীবনের শেষ দিনগুলো সন্তানের হিসাব-নিকাশের মধ্যে কাটবে?
আমাদের প্রত্যেকেরই একবার থামা দরকার। একবার নিজের শৈশবের দিকে ফিরে তাকানো দরকার। একবার বাবার মুখ মনে করা দরকার। একবার মায়ের হাতটা ধরে ভাবা দরকার—এই হাতটি আর কতদিন আমাদের মাথায় থাকবে? হয়তো তখন অনেক হিসাবের প্রয়োজনই থাকবে না।
হয়তো তখন বোঝা যাবে—বাবার ভিটে শুধু মাটির টুকরো নয়। মা শুধু একজন বৃদ্ধা নন। ভাই শুধু উত্তরাধিকারী নন। বোন শুধু অংশীদার নন। পরিবার শুধু সম্পদের সমষ্টি নয়। পরিবার হলো একটি দীর্ঘ স্মৃতি, যেখানে কেউ একজন নিজের অংশের সুখ ছেড়ে অন্যজনের জন্য ছায়া হয়ে দাঁড়ায়।
আর সেই ছায়ার মূল্য বোঝা যায় সবচেয়ে বেশি তখনই, যখন একদিন মাথার ওপর আর কোনো ছায়া থাকে না।
তাই আসুন, আমরা উত্তরাধিকার নিয়ে ভাবার আগে উত্তরাধিকার হিসেবে কী রেখে যাচ্ছি, সেটি ভাবি। জমি রেখে যাব? বাড়ি রেখে যাব? টাকা রেখে যাব? নাকি এমন একটি পরিবার রেখে যাব, যেখানে আমাদের চলে যাওয়ার পরও সন্তানরা একে অপরের হাত ধরে বলবে—“আমরা একই বাবা-মায়ের সন্তান। আমাদের মধ্যে কোনো সম্পদ এত বড় নয়, যা আমাদের সম্পর্কের চেয়ে বড় হতে পারে।”
হয়তো এটাই একজন বাবার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। হয়তো এটাই একজন মায়ের সবচেয়ে বড় প্রার্থনা। আর হয়তো একজন বড় ভাইয়ের সবচেয়ে বড় ত্যাগের মূল্যও এখানেই—সে সম্পদ চায়নি, সে শুধু চেয়েছিল পরিবারের মানুষগুলো মানুষ হয়ে থাকুক।
শেষ পর্যন্ত মানুষ কতটুকু জমি পেল, কতটুকু টাকা পেল, কে কার অংশ নিল—এসব ইতিহাসে খুব বেশি দিন থাকে না। কিন্তু একজন মানুষ তার বাবা-মায়ের সঙ্গে কেমন আচরণ করেছে, ভাইয়ের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে কি না, নিজের স্বার্থের জন্য সম্পর্ক বিক্রি করেছে কি না—এই গল্পগুলো মানুষের মনে অনেক দিন বেঁচে থাকে।
তাই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যদি কেউ বলতে পারে—“আমি কারও অধিকার কেড়ে নিইনি। আমি আমার মাকে যতদিন পেরেছি পাশে রেখেছি। আমি আমার ভাইদের জন্য যতটুকু পেরেছি করেছি। আমি বাবার স্মৃতিকে সম্পদের চেয়ে বড় করে দেখেছি। আর সবশেষে, আমি সম্পর্ক হারিয়ে সম্পদ জিততে চাইনি”—তাহলে হয়তো তার হাতে খুব বেশি সম্পদ নেই, কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকারটি আছে—একটি পরিষ্কার বিবেক।
আর পৃথিবীর সব সম্পদ হারিয়েও যে মানুষটি নিজের বিবেকটুকু ধরে রাখতে পারে, প্রকৃত অর্থে সে-ই হয়তো সবচেয়ে ধনী।কারণ বাবার ভিটে একদিন অন্যের হতে পারে, সম্পত্তি একদিন ভাগ হয়ে যেতে পারে, টাকা একদিন শেষ হয়ে যেতে পারে—কিন্তু বাবা-মায়ের ভালোবাসার ঋণ কোনোদিন ভাগ হয় না।
সেই ঋণ শুধু ভালোবাসা দিয়ে শোধ করতে হয়।আর তার সবচেয়ে সুন্দর উপায়—মা যতদিন আছেন, তাঁকে আগলে রাখা; ভাই যতদিন আছে, তাকে ভাই হিসেবে সম্মান করা; বোন যতদিন আছে, তাকে বোন হিসেবে ভালোবাসা; আর বাবা না থাকলেও তাঁর শিক্ষা ও স্মৃতিকে জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ করে রাখা।
হয়তো এভাবেই একদিন কোনো এক বাড়ির উঠোনে আবার ভাই-বোনেরা পাশাপাশি দাঁড়াবে। হয়তো কোনো বৃদ্ধ মা দূর থেকে তাকিয়ে মৃদু হাসবেন। হয়তো বাবার ছবির সামনে কেউ দাঁড়িয়ে মনে মনে বলবে—
“বাবা, আমরা তোমার সম্পত্তি রক্ষা করতে পারিনি হয়তো, কিন্তু তোমার সন্তানদের সম্পর্কটুকু রক্ষা করার চেষ্টা করেছি।”সেদিন হয়তো বাবার আত্মার জন্য সেটাই হবে সবচেয়ে বড় শান্তি।আর সেই দিনটির অপেক্ষায় কোনো এক বড় ভাই হয়তো আজও নীরবে দাঁড়িয়ে আছে—অভিমান নিয়ে, কষ্ট নিয়ে, কিন্তু ঘৃণা ছাড়া।
কারণ সে জানে—ছায়া দেওয়া বৃক্ষ কখনো তার ছায়ার হিসাব করে না।
সে শুধু চায়, তার ছায়ায় যারা বড় হয়েছে, তারা যেন একদিন নিজেরাও কারও জন্য ছায়া হয়ে দাঁড়ায়।
গড় রেটিং: ০/৫ (০ ভোট)
ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৪:১০ অপরাহ্ণ
জীবনের কিছু গল্প সংবাদ হয় না, কোনো থানায় তার জিডি হয় না, আদালতের কোনো নথিতে তার হিসাব লেখা থাকে না। অথচ সেই গল্পগুলোই কখনো কখনো একজন মানুষের বুকের ভেতর সবচেয়ে দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেঁচে থাকে। এমনই একটি গল্প একটি পুরোনো বাড়ির। বাড়িটিতে একসময় অনেকগুলো কণ্ঠ ছিল, হাসি ছিল, অভিমান ছিল, ছোটদের দৌড়ঝাঁপ ছিল, মায়ের ডাক ছিল, বাবার শাসন ছিল। একই উঠোনে ভাই-বোনেরা বড় হয়েছে। একজনের কষ্টে অন্যজন কেঁদেছে, একজনের আনন্দে অন্যজন হেসেছে। তখন কেউ ভাবেনি—একদিন এই বাড়ির প্রতিটি ইঞ্চি জায়গা, প্রতিটি ঘর, প্রতিটি স্মৃতি হিসাবের খাতায় উঠবে। কারণ শৈশবে মানুষ সম্পত্তির হিসাব বোঝে না, বোঝে শুধু মায়ের আঁচল আর বাবার হাত।
এই পরিবারের বড় সন্তানটি খুব ছোট বয়স থেকেই বুঝেছিল দায়িত্ব কী জিনিস। মায়ের অসুস্থতার কারণে ছোট ভাইদের কোলে-পিঠে করে বড় করেছে। তাদের ক্ষুধা, পড়াশোনা, প্রয়োজন—সবকিছুকে নিজের প্রয়োজনের আগে রেখেছে। চাকরি জীবনের দীর্ঘ ষোলো বছর সে কী আয় করেছে, কতটা নিজের জন্য রেখেছে আর কতটা পরিবারের জন্য দিয়েছে—তার কোনো খাতা সে রাখেনি। কারণ কিছু মানুষ পরিবারের জন্য কাজ করার সময় হিসাব করে না। তারা ভাবে—আজ ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার প্রয়োজন, কাল তার ভবিষ্যৎ হবে; আজ সংসারে টাকা দরকার, কাল পরিস্থিতি ভালো হবে; আজ নিজের ইচ্ছেটা বাদ দিলাম, একদিন সবাই মিলে ভালো থাকব। এটাই ছিল তার ভালোবাসা।
কখনো ভাবেনি, একদিন সেই ত্যাগের হিসাব কাউকে বলতে হবে। কারণ সে বিশ্বাস করেছিল, ভাইকে সাহায্য করলে তার কাছে হিসাব রাখতে হয় না, পরিবারের জন্য করলে কৃতিত্ব চাইতে হয় না, ছোটদের মানুষ করলে একদিন তারা বড় হয়ে বুঝবে—এই আশাটুকুই যথেষ্ট। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা হলো, যে ত্যাগ আমরা ভালোবাসা দিয়ে করি, তার স্মৃতি অন্যের হৃদয়ে একইভাবে বেঁচে থাকবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
সময় চলে যায়। ছোটরা বড় হয়। যে ভাই একসময় বড় ভাইয়ের হাত ধরে হাঁটত, একদিন সে নিজের পথ খুঁজে নেয়। যে বোন একসময় একই উঠোনে খেলত, একদিন তার নিজের সংসার হয়। তারপর ধীরে ধীরে একই পরিবারের মানুষদের মধ্যেও তৈরি হয় অদৃশ্য দেয়াল। কেউ সেই দেয়াল দেখে না, কিন্তু সবাই তার ঠান্ডা স্পর্শ অনুভব করে।
এরই মধ্যে একদিন বাবা চলে যান। মৃত্যুর সময় পাশে থাকতে না-পারা সন্তানের কষ্ট পৃথিবীর সবচেয়ে নীরব কষ্টগুলোর একটি। মানুষ তখন নিজেকেই প্রশ্ন করে—আরেকটু আগে যদি যেতে পারতাম, আরেকবার যদি বাবার হাতটা ধরতে পারতাম! কিন্তু মৃত্যু কাউকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয় না। তবুও বাবারা চলে যাওয়ার আগে কিছু কথা রেখে যান—যেগুলো কখনো কখনো সম্পদের চেয়েও বড় উত্তরাধিকার হয়ে দাঁড়ায়।
সেই বাবাও তাঁর সন্তানদের সামনে শেষ সময়ে বলে গিয়েছিলেন—মা যতদিন বেঁচে থাকবেন, তাঁর প্রয়োজনের অর্থে যেন কেউ হাত না বাড়ায়; মাকে যেন দেখা হয়, তাঁর শেষ দিনগুলো যেন নিরাপদ ও সম্মানের হয়; ছোট সন্তানটির দিকেও যেন বড় ভাইয়ের দায়িত্ব থাকে। বাবা হয়তো জানতেন না, তাঁর চলে যাওয়ার পর তাঁর এই কথাগুলোই একদিন সন্তানদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।
বাবা চলে গেলেন। বড় ভাইয়েরাও একে একে চলে গেলেন। রয়ে গেলেন মা। আর রয়ে গেল বাবার ভিটেবাড়ি, কিছু সম্পদ, কিছু স্মৃতি এবং অনেকগুলো সম্পর্ক। তারপর শুরু হলো হিসাব—কে কত পাবে, কে কতটুকু পাবে, কার অধিকার কতটুকু, কার কথা ঠিক, কার কথা ভুল। অথচ সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি যেন কোথাও হারিয়ে গেল—মা কতদিন আছেন?
আমরা কি কখনো ভাবি, সম্পত্তির কাগজ নিয়ে যে মানুষগুলো আজ তর্ক করছে, সেই কাগজগুলো একদিন থাকবে; কিন্তু যার জন্য এত হিসাব, সেই মানুষটি হয়তো থাকবে না? মায়ের হাতে থাকা অর্থ নিয়ে যদি সন্তানদের মধ্যে হিসাব শুরু হয়, তাহলে কি সেই অর্থের মূল্য সত্যিই থাকে? একজন মা তাঁর সন্তানদের জন্ম দেন ভাগাভাগির জন্য নয়, একসঙ্গে থাকার জন্য। তিনি চান না, তাঁর জীবনের শেষ বিকেলে সন্তানরা তাঁর সম্পদের হিসাব করুক। তিনি চান, তাঁর সন্তানদের মুখগুলো একসঙ্গে দেখতে।কিন্তু আমরা অনেক সময় মায়ের জীবনের শেষ বিকেলটুকুও হিসাবের খাতায় পরিণত করি। এটাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় বেদনা।
যে বড় ভাইটি একসময় ছোট ভাইদের মানুষ করার জন্য নিজের জীবনের ষোলোটি বছর পার করে দিল, সে আজও কোনো সম্পত্তির মালিক হতে চায় না। তার একমাত্র ইচ্ছা—মা যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন বাবার ভিটেবাড়িতে থেকে মায়ের পাশে থাকা। কারণ তার কাছে সেই বাড়ি কোনো জমি নয়; সেটি বাবার কণ্ঠের প্রতিধ্বনি, মায়ের ভালোবাসার ঘ্রাণ, শৈশবের উঠোন, ভাই-বোনের একসঙ্গে বড় হয়ে ওঠার স্মৃতি।
সেই মানুষটি জানে, একদিন মা-ও চলে যাবেন। তারপর হয়তো সেই বাড়ির প্রতিটি দেয়ালই তার কাছে অসহ্য হয়ে উঠবে। হয়তো তখন সে কোনো দাবি নিয়ে দাঁড়াবে না, কোনো সম্পত্তির জন্য লড়বে না। হয়তো একদিন সত্যিই বলবে—“যতদূর চোখ যায়, আমি চলে যাব। সঙ্গে নেব শুধু বাবা-মায়ের স্মৃতি।”
এ কি পরাজয়? না। কখনো কখনো সরে যাওয়া পরাজয় নয়; বরং সম্পর্কের শেষ অবশিষ্ট সম্মানটুকু বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা।কারও সম্পদ না নিয়েও মানুষ ধনী হতে পারে। কারও সম্পত্তির উত্তরাধিকারী না হয়েও মানুষ তার বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার বহন করতে পারে। সেই উত্তরাধিকার হলো—ভালোবাসা, দায়িত্ব, ক্ষমা এবং মানুষের প্রতি সম্মান।
আজকের সমাজে আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো অর্থের অভাব নয়; আমাদের সংকট হলো অর্থের কাছে সম্পর্কের পরাজয়। এক ভাই আরেক ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে না, কারণ জমির সীমানা কয়েক হাত এদিক-ওদিক। এক বোন ভাইয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, কারণ সম্পত্তির হিসাব তার মনমতো হয়নি। সন্তান মায়ের দিকে তাকানোর আগে হিসাব করে—মায়ের কাছে কী আছে। আর বাবা-মা জীবিত থাকা অবস্থাতেই সন্তানরা তাঁদের মৃত্যুর পরের সম্পদের হিসাব শুরু করে।
আমরা কি ভুলে যাচ্ছি—একদিন আমরাও বৃদ্ধ হব?একদিন আমাদেরও হয়তো একটি সন্তান আমাদের দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে, আমরা তার কাছে মানুষ নাকি শুধু একটি দায়িত্ব। সেদিন যেন আমাদের সন্তানরা আমাদের সম্পদের জন্য নয়, আমাদের ভালোবাসার জন্য পাশে দাঁড়ায়—এই শিক্ষা আজ থেকেই দিতে হবে।কারণ সন্তানকে সম্পত্তি দিয়ে বড় করা যায়, কিন্তু মানুষ করতে হলে মূল্যবোধ দিতে হয়।
একজন বড় ভাইয়ের ষোলো বছরের ত্যাগ হয়তো কোনো দলিলে লেখা থাকবে না। সে কত রাত পরিবারের চিন্তায় ঘুমাতে পারেনি, কত নিজের প্রয়োজন বাদ দিয়েছে, কতবার ছোট ভাইয়ের প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজনের ওপরে রেখেছে—এসবের কোনো উত্তরাধিকার সনদ নেই। কিন্তু মানুষের বিবেকের আদালতে এসবের মূল্য আছে। সেই আদালতের বিচারক কোনো মানুষ নয়—সময়। সময় একদিন সব হিসাব বুঝিয়ে দেয়।তখন হয়তো কেউ বুঝবে—যে মানুষটিকে অবহেলা করেছিলাম, সে আসলে আমাদের শত্রু ছিল না। সে ছিল সেই মানুষটি, যে একসময় আমাদের জন্য নিজের জীবন থেকে অনেকটা সময় নিঃশব্দে দিয়ে দিয়েছিল। তখন হয়তো মনে পড়বে—একসময় আমরা সবাই একই মায়ের সন্তান ছিলাম, একই বাবার হাত ধরে বড় হয়েছিলাম, একই উঠোনে খেলেছিলাম, একই থালার ভাত ভাগ করে খেয়েছিলাম।
তাহলে আজ কেন একটি জমির টুকরো আমাদের সম্পর্কের চেয়ে বড় হবে? কেন বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ বাবার রেখে যাওয়া ভালোবাসার চেয়ে বড় হবে? কেন মায়ের জীবনের শেষ দিনগুলো সন্তানের হিসাব-নিকাশের মধ্যে কাটবে?
আমাদের প্রত্যেকেরই একবার থামা দরকার। একবার নিজের শৈশবের দিকে ফিরে তাকানো দরকার। একবার বাবার মুখ মনে করা দরকার। একবার মায়ের হাতটা ধরে ভাবা দরকার—এই হাতটি আর কতদিন আমাদের মাথায় থাকবে? হয়তো তখন অনেক হিসাবের প্রয়োজনই থাকবে না।
হয়তো তখন বোঝা যাবে—বাবার ভিটে শুধু মাটির টুকরো নয়। মা শুধু একজন বৃদ্ধা নন। ভাই শুধু উত্তরাধিকারী নন। বোন শুধু অংশীদার নন। পরিবার শুধু সম্পদের সমষ্টি নয়। পরিবার হলো একটি দীর্ঘ স্মৃতি, যেখানে কেউ একজন নিজের অংশের সুখ ছেড়ে অন্যজনের জন্য ছায়া হয়ে দাঁড়ায়।
আর সেই ছায়ার মূল্য বোঝা যায় সবচেয়ে বেশি তখনই, যখন একদিন মাথার ওপর আর কোনো ছায়া থাকে না।
তাই আসুন, আমরা উত্তরাধিকার নিয়ে ভাবার আগে উত্তরাধিকার হিসেবে কী রেখে যাচ্ছি, সেটি ভাবি। জমি রেখে যাব? বাড়ি রেখে যাব? টাকা রেখে যাব? নাকি এমন একটি পরিবার রেখে যাব, যেখানে আমাদের চলে যাওয়ার পরও সন্তানরা একে অপরের হাত ধরে বলবে—“আমরা একই বাবা-মায়ের সন্তান। আমাদের মধ্যে কোনো সম্পদ এত বড় নয়, যা আমাদের সম্পর্কের চেয়ে বড় হতে পারে।”
হয়তো এটাই একজন বাবার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। হয়তো এটাই একজন মায়ের সবচেয়ে বড় প্রার্থনা। আর হয়তো একজন বড় ভাইয়ের সবচেয়ে বড় ত্যাগের মূল্যও এখানেই—সে সম্পদ চায়নি, সে শুধু চেয়েছিল পরিবারের মানুষগুলো মানুষ হয়ে থাকুক।
শেষ পর্যন্ত মানুষ কতটুকু জমি পেল, কতটুকু টাকা পেল, কে কার অংশ নিল—এসব ইতিহাসে খুব বেশি দিন থাকে না। কিন্তু একজন মানুষ তার বাবা-মায়ের সঙ্গে কেমন আচরণ করেছে, ভাইয়ের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে কি না, নিজের স্বার্থের জন্য সম্পর্ক বিক্রি করেছে কি না—এই গল্পগুলো মানুষের মনে অনেক দিন বেঁচে থাকে।
তাই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যদি কেউ বলতে পারে—“আমি কারও অধিকার কেড়ে নিইনি। আমি আমার মাকে যতদিন পেরেছি পাশে রেখেছি। আমি আমার ভাইদের জন্য যতটুকু পেরেছি করেছি। আমি বাবার স্মৃতিকে সম্পদের চেয়ে বড় করে দেখেছি। আর সবশেষে, আমি সম্পর্ক হারিয়ে সম্পদ জিততে চাইনি”—তাহলে হয়তো তার হাতে খুব বেশি সম্পদ নেই, কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকারটি আছে—একটি পরিষ্কার বিবেক।
আর পৃথিবীর সব সম্পদ হারিয়েও যে মানুষটি নিজের বিবেকটুকু ধরে রাখতে পারে, প্রকৃত অর্থে সে-ই হয়তো সবচেয়ে ধনী।কারণ বাবার ভিটে একদিন অন্যের হতে পারে, সম্পত্তি একদিন ভাগ হয়ে যেতে পারে, টাকা একদিন শেষ হয়ে যেতে পারে—কিন্তু বাবা-মায়ের ভালোবাসার ঋণ কোনোদিন ভাগ হয় না।
সেই ঋণ শুধু ভালোবাসা দিয়ে শোধ করতে হয়।আর তার সবচেয়ে সুন্দর উপায়—মা যতদিন আছেন, তাঁকে আগলে রাখা; ভাই যতদিন আছে, তাকে ভাই হিসেবে সম্মান করা; বোন যতদিন আছে, তাকে বোন হিসেবে ভালোবাসা; আর বাবা না থাকলেও তাঁর শিক্ষা ও স্মৃতিকে জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ করে রাখা।
হয়তো এভাবেই একদিন কোনো এক বাড়ির উঠোনে আবার ভাই-বোনেরা পাশাপাশি দাঁড়াবে। হয়তো কোনো বৃদ্ধ মা দূর থেকে তাকিয়ে মৃদু হাসবেন। হয়তো বাবার ছবির সামনে কেউ দাঁড়িয়ে মনে মনে বলবে—
“বাবা, আমরা তোমার সম্পত্তি রক্ষা করতে পারিনি হয়তো, কিন্তু তোমার সন্তানদের সম্পর্কটুকু রক্ষা করার চেষ্টা করেছি।”সেদিন হয়তো বাবার আত্মার জন্য সেটাই হবে সবচেয়ে বড় শান্তি।আর সেই দিনটির অপেক্ষায় কোনো এক বড় ভাই হয়তো আজও নীরবে দাঁড়িয়ে আছে—অভিমান নিয়ে, কষ্ট নিয়ে, কিন্তু ঘৃণা ছাড়া।
কারণ সে জানে—ছায়া দেওয়া বৃক্ষ কখনো তার ছায়ার হিসাব করে না।
সে শুধু চায়, তার ছায়ায় যারা বড় হয়েছে, তারা যেন একদিন নিজেরাও কারও জন্য ছায়া হয়ে দাঁড়ায়।
