তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় ও বিস্ময়কর অগ্রগতি মানবসভ্যতাকে এক নতুন যুগে পৌঁছে দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবটিকস, সাইবারপ্রযুক্তি এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রব্যবস্থা মানুষের সক্ষমতাকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে, যা মাত্র কয়েক দশক আগেও কল্পনা করা অসম্ভব ছিল। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই উৎকর্ষ একদিকে মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করেছে, চিকিৎসা ও শিক্ষায় খুলছে নতুন সম্ভাবনার দ্বার; অন্যদিকে এর অনিয়ন্ত্রিত চর্চা ও অপব্যবহার মানবজাতির অস্তিত্বকেই এক চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আগামী ১০০ বছরে প্রযুক্তির সুষম নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা না গেলে তা সভ্যতার জন্য মহা বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
ঘরে বসেই যুদ্ধ ও দূরনিয়ন্ত্রিত ধ্বংসযজ্ঞ
একসময় যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানা ছিল সরাসরি উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে যুদ্ধের প্রেক্ষাপট আমূল বদলে গেছে। দূরনিয়ন্ত্রিত ড্রোন, সাইবার হামলা এবং স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম অস্ত্রের মাধ্যমে এখন হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বসেই যেকোনো দেশের ওপর প্রাণঘাতী সামরিক অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে।
আগামী এক শতাব্দীতে এই ধ্বংসাত্মক সক্ষমতা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে কোনো কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বা একক ব্যক্তি নিজের ঘরে বসেই অন্য কোনো দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎব্যবস্থা, যোগাযোগ অবকাঠামো বা অর্থব্যবস্থাকে মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ করে দিতে পারবে। তদুপরি, মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ছাড়া যদি স্বয়ংক্রিয় প্রাণঘাতী অস্ত্র (Lethal Autonomous Weapons) স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে, তবে সামান্য কোনো যান্ত্রিক ভুল বা অনিয়ন্ত্রিত উদ্দীপনা থেকেই বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ সংঘাতের দাবানল জ্বলে উঠতে পারে।
প্রযুক্তির এই বেপরোয়া গতি তাই আজ এক মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে—মানুষ কি তার নিজের উদ্ভাবিত প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে, নাকি প্রযুক্তির অপব্যবহার মানুষের নিয়ন্ত্রণকে চিরতরে কেড়ে নেবে?
আগামী শতাব্দীর প্রেক্ষাপট: স্বর্ণযুগ নাকি মহাবিপর্যয়?
২০২৬ অতিক্রম করে আগামী ২১২৬ সালের বিশ্ব আজকের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপ ধারণ করতে পারে। দৈনন্দিন জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ—সবক্ষেত্রেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। উন্নত চিকিৎসাবিজ্ঞান বহু মারণব্যাধিকে পরাস্ত করবে, উৎপাদন খাতে বিপ্লব আসবে এবং মহাকাশ গবেষণায় রচিত হবে নতুন ইতিহাস।
তবে এই অর্জনের উল্টো পিঠে রয়েছে গভীর এক অন্ধকার। প্রযুক্তির অসীম ক্ষমতা ও সুবিধা যদি বিশ্বমঞ্চে হাতেগোনা কয়েকটি রাষ্ট্র, প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান বা একক গোষ্ঠীর হাতে পুঞ্জীভূত হয়, তবে বৈশ্বিক বৈষম্য ও শক্তির ভারসাম্যহীনতা চরম আকার ধারণ করবে। উন্নত নজরদারি প্রযুক্তি মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গোপনীয়তার অধিকারকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করতে পারে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সাইবার যুদ্ধ, স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র এবং বিধ্বংসী প্রযুক্তির অসম প্রতিযোগিতা বিশ্বশান্তিকে এক খাদের কিনারে নিয়ে দাঁড় করাবে।
সংক্ষেপে, আগামী শতাব্দী একই সাথে হতে পারে মানবসভ্যতার এক অনবদ্য ‘স্বর্ণযুগ’, কিংবা প্রযুক্তির অপব্যবহারে চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়া এক ‘মহাবিপর্যয়’। এটি কোন পথে ধাবিত হবে, তা নির্ভর করছে আজকের দিনে নেওয়া আমাদের রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তের ওপর।
ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্বশীল উদ্ভাবন
প্রযুক্তির জোয়ারকে সম্পূর্ণ থামিয়ে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়, আর না জেনে-বুঝে সব প্রযুক্তিকে অবাধে বাড়তে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। সমাধান রয়েছে ভারসাম্যপূর্ণ ও দায়িত্বশীল ব্যবহারে।
যেসব প্রযুক্তি ব্যাপক প্রাণহানি, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধস বা মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য চরম হুমকি সৃষ্টি করতে পারে, সেগুলোর গবেষণা ও ব্যবহারে সুনির্দিষ্ট এবং কঠোর বাধ্যবাধকতা আরোপ করা অপরিহার্য। বিশেষত, যেকোনো ধরনের প্রাণঘাতী সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তি উদ্ভাবক প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্বশীলতা ও দায়বদ্ধতা নির্ধারণে আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।
প্রযুক্তির বিকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে গিয়ে মানবজাতির সামগ্রিক নিরাপত্তাকে কোনোভাবেই বলিকাতায় ফেলা যাবে না। একইভাবে নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে মানবকল্যাণমূলক গবেষণা, শিক্ষা কিংবা চিকিৎসার পথ রুদ্ধ করাও সমীচীন নয়। প্রয়োজন ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ এবং দায়িত্বশীল উদ্ভাবনের এক সুষম সমন্বয়।
জাতিসংঘের নেতৃত্বে বিশ্বব্যাপী ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগের তাগিদ
প্রযুক্তির ঝুঁকির কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই। এক দেশে উদ্ভাবিত ক্ষতিকর সাইবার ভাইরাস বা বায়ো-টেক প্রযুক্তি নিমিষেই পুরো বিশ্বকে অচল করে দিতে পারে। তাই এই বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের নেতৃত্বে একটি কার্যকর, স্বচ্ছ ও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
এই আন্তর্জাতিক কাঠামোর অধীনে:
• উচ্চঝুঁকিপূর্ণ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অভিন্ন বিশ্বনীতি প্রণয়ন: উচ্চমাত্রার এআই ও বায়ো-প্রযুক্তির গবেষণায় কঠোর আন্তর্জাতিক নীতিমালা তৈরি করতে হবে।
• স্বয়ংক্রিয় প্রাণঘাতী অস্ত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা: মানুষের নিয়ন্ত্রণহীন স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র তৈরি ও ব্যবহারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রণয়ন করতে হবে।
• সাইবার নিরাপত্তা ও স্বাধীন তদারকি: বিশ্বব্যাপী সাইবার আক্রমণ প্রতিরোধে সমন্বিত তথ্য আদান-প্রদান এবং বিপজ্জনক প্রযুক্তির নিরপেক্ষ নিরাপত্তা মূল্যায়নের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
• প্রয়োজনে নির্দিষ্ট প্রযুক্তিতে নিষেধাজ্ঞা: মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য সরাসরি হুমকি এমন কোনো প্রযুক্তি উদ্ভাবনে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে।
এই পদক্ষেপে কেবল প্রভাবশালী বা উন্নত রাষ্ট্রগুলোই নয়, বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমান অংশগ্রহণ ও মতামত নিশ্চিত করতে হবে; যাতে প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের আইনি কাঠামোটি কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থরক্ষার হাতিয়ারে পরিণত না হতে পারে।
উপসংহার
প্রযুক্তি মানববুদ্ধিমত্তার অন্যতম সেরা ও শ্রেষ্ঠ অর্জন। কিন্তু উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণ, নৈতিকতা এবং জবাবদিহিতা না থাকলে এই অর্জনই একদিন মানবজাতির ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আগামী ১০০ বছর পর পৃথিবী কোন রূপ নেবে তা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও, প্রযুক্তির চোখরাঙানো সম্ভাব্য বিপদগুলোকে আজ উপেক্ষা করলে কাল তা মোকাবিলার আর কোনো সুযোগ অবশিষ্ট থাকবে না।
প্রযুক্তির ধ্বংসাত্মক রূপ ঠেকাতে এখনই জাতিসংঘসহ শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর উদ্যোগে সুনির্দিষ্ট চুক্তি ও নীতিমালা গ্রহণ করা প্রয়োজন। আমরা এমন এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি, যেখানে প্রযুক্তি মানুষের জীবন কেড়ে নেবে না বরং জীবন রক্ষা করবে; বিজ্ঞান কোনো যুদ্ধের চক্রান্ত হবে না, বরং হবে বিশ্বশান্তির অনন্য হাতিয়ার। কারণ, প্রযুক্তির অগ্রগতি তখনই প্রকৃত অর্থে কল্যাণ বয়ে আনবে, যখন তার রাশ থাকবে মানুষের হাতে এবং তা নিশ্চিত করবে পুরো মানবসভ্যতার নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা।
গড় রেটিং: ৫/৫ (১ ভোট)
ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০৭ অপরাহ্ণ
তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় ও বিস্ময়কর অগ্রগতি মানবসভ্যতাকে এক নতুন যুগে পৌঁছে দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবটিকস, সাইবারপ্রযুক্তি এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রব্যবস্থা মানুষের সক্ষমতাকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে, যা মাত্র কয়েক দশক আগেও কল্পনা করা অসম্ভব ছিল। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই উৎকর্ষ একদিকে মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করেছে, চিকিৎসা ও শিক্ষায় খুলছে নতুন সম্ভাবনার দ্বার; অন্যদিকে এর অনিয়ন্ত্রিত চর্চা ও অপব্যবহার মানবজাতির অস্তিত্বকেই এক চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আগামী ১০০ বছরে প্রযুক্তির সুষম নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা না গেলে তা সভ্যতার জন্য মহা বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
ঘরে বসেই যুদ্ধ ও দূরনিয়ন্ত্রিত ধ্বংসযজ্ঞ
একসময় যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানা ছিল সরাসরি উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে যুদ্ধের প্রেক্ষাপট আমূল বদলে গেছে। দূরনিয়ন্ত্রিত ড্রোন, সাইবার হামলা এবং স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম অস্ত্রের মাধ্যমে এখন হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বসেই যেকোনো দেশের ওপর প্রাণঘাতী সামরিক অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে।
আগামী এক শতাব্দীতে এই ধ্বংসাত্মক সক্ষমতা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে কোনো কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বা একক ব্যক্তি নিজের ঘরে বসেই অন্য কোনো দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎব্যবস্থা, যোগাযোগ অবকাঠামো বা অর্থব্যবস্থাকে মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ করে দিতে পারবে। তদুপরি, মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ছাড়া যদি স্বয়ংক্রিয় প্রাণঘাতী অস্ত্র (Lethal Autonomous Weapons) স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে, তবে সামান্য কোনো যান্ত্রিক ভুল বা অনিয়ন্ত্রিত উদ্দীপনা থেকেই বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ সংঘাতের দাবানল জ্বলে উঠতে পারে।
প্রযুক্তির এই বেপরোয়া গতি তাই আজ এক মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে—মানুষ কি তার নিজের উদ্ভাবিত প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে, নাকি প্রযুক্তির অপব্যবহার মানুষের নিয়ন্ত্রণকে চিরতরে কেড়ে নেবে?
আগামী শতাব্দীর প্রেক্ষাপট: স্বর্ণযুগ নাকি মহাবিপর্যয়?
২০২৬ অতিক্রম করে আগামী ২১২৬ সালের বিশ্ব আজকের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপ ধারণ করতে পারে। দৈনন্দিন জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ—সবক্ষেত্রেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। উন্নত চিকিৎসাবিজ্ঞান বহু মারণব্যাধিকে পরাস্ত করবে, উৎপাদন খাতে বিপ্লব আসবে এবং মহাকাশ গবেষণায় রচিত হবে নতুন ইতিহাস।
তবে এই অর্জনের উল্টো পিঠে রয়েছে গভীর এক অন্ধকার। প্রযুক্তির অসীম ক্ষমতা ও সুবিধা যদি বিশ্বমঞ্চে হাতেগোনা কয়েকটি রাষ্ট্র, প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান বা একক গোষ্ঠীর হাতে পুঞ্জীভূত হয়, তবে বৈশ্বিক বৈষম্য ও শক্তির ভারসাম্যহীনতা চরম আকার ধারণ করবে। উন্নত নজরদারি প্রযুক্তি মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গোপনীয়তার অধিকারকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করতে পারে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সাইবার যুদ্ধ, স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র এবং বিধ্বংসী প্রযুক্তির অসম প্রতিযোগিতা বিশ্বশান্তিকে এক খাদের কিনারে নিয়ে দাঁড় করাবে।
সংক্ষেপে, আগামী শতাব্দী একই সাথে হতে পারে মানবসভ্যতার এক অনবদ্য ‘স্বর্ণযুগ’, কিংবা প্রযুক্তির অপব্যবহারে চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়া এক ‘মহাবিপর্যয়’। এটি কোন পথে ধাবিত হবে, তা নির্ভর করছে আজকের দিনে নেওয়া আমাদের রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তের ওপর।
ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্বশীল উদ্ভাবন
প্রযুক্তির জোয়ারকে সম্পূর্ণ থামিয়ে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়, আর না জেনে-বুঝে সব প্রযুক্তিকে অবাধে বাড়তে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। সমাধান রয়েছে ভারসাম্যপূর্ণ ও দায়িত্বশীল ব্যবহারে।
যেসব প্রযুক্তি ব্যাপক প্রাণহানি, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধস বা মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য চরম হুমকি সৃষ্টি করতে পারে, সেগুলোর গবেষণা ও ব্যবহারে সুনির্দিষ্ট এবং কঠোর বাধ্যবাধকতা আরোপ করা অপরিহার্য। বিশেষত, যেকোনো ধরনের প্রাণঘাতী সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তি উদ্ভাবক প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্বশীলতা ও দায়বদ্ধতা নির্ধারণে আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।
প্রযুক্তির বিকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে গিয়ে মানবজাতির সামগ্রিক নিরাপত্তাকে কোনোভাবেই বলিকাতায় ফেলা যাবে না। একইভাবে নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে মানবকল্যাণমূলক গবেষণা, শিক্ষা কিংবা চিকিৎসার পথ রুদ্ধ করাও সমীচীন নয়। প্রয়োজন ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ এবং দায়িত্বশীল উদ্ভাবনের এক সুষম সমন্বয়।
জাতিসংঘের নেতৃত্বে বিশ্বব্যাপী ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগের তাগিদ
প্রযুক্তির ঝুঁকির কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই। এক দেশে উদ্ভাবিত ক্ষতিকর সাইবার ভাইরাস বা বায়ো-টেক প্রযুক্তি নিমিষেই পুরো বিশ্বকে অচল করে দিতে পারে। তাই এই বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের নেতৃত্বে একটি কার্যকর, স্বচ্ছ ও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
এই আন্তর্জাতিক কাঠামোর অধীনে:
• উচ্চঝুঁকিপূর্ণ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অভিন্ন বিশ্বনীতি প্রণয়ন: উচ্চমাত্রার এআই ও বায়ো-প্রযুক্তির গবেষণায় কঠোর আন্তর্জাতিক নীতিমালা তৈরি করতে হবে।
• স্বয়ংক্রিয় প্রাণঘাতী অস্ত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা: মানুষের নিয়ন্ত্রণহীন স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র তৈরি ও ব্যবহারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রণয়ন করতে হবে।
• সাইবার নিরাপত্তা ও স্বাধীন তদারকি: বিশ্বব্যাপী সাইবার আক্রমণ প্রতিরোধে সমন্বিত তথ্য আদান-প্রদান এবং বিপজ্জনক প্রযুক্তির নিরপেক্ষ নিরাপত্তা মূল্যায়নের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
• প্রয়োজনে নির্দিষ্ট প্রযুক্তিতে নিষেধাজ্ঞা: মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য সরাসরি হুমকি এমন কোনো প্রযুক্তি উদ্ভাবনে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে।
এই পদক্ষেপে কেবল প্রভাবশালী বা উন্নত রাষ্ট্রগুলোই নয়, বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমান অংশগ্রহণ ও মতামত নিশ্চিত করতে হবে; যাতে প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের আইনি কাঠামোটি কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থরক্ষার হাতিয়ারে পরিণত না হতে পারে।
উপসংহার
প্রযুক্তি মানববুদ্ধিমত্তার অন্যতম সেরা ও শ্রেষ্ঠ অর্জন। কিন্তু উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণ, নৈতিকতা এবং জবাবদিহিতা না থাকলে এই অর্জনই একদিন মানবজাতির ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আগামী ১০০ বছর পর পৃথিবী কোন রূপ নেবে তা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও, প্রযুক্তির চোখরাঙানো সম্ভাব্য বিপদগুলোকে আজ উপেক্ষা করলে কাল তা মোকাবিলার আর কোনো সুযোগ অবশিষ্ট থাকবে না।
প্রযুক্তির ধ্বংসাত্মক রূপ ঠেকাতে এখনই জাতিসংঘসহ শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর উদ্যোগে সুনির্দিষ্ট চুক্তি ও নীতিমালা গ্রহণ করা প্রয়োজন। আমরা এমন এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি, যেখানে প্রযুক্তি মানুষের জীবন কেড়ে নেবে না বরং জীবন রক্ষা করবে; বিজ্ঞান কোনো যুদ্ধের চক্রান্ত হবে না, বরং হবে বিশ্বশান্তির অনন্য হাতিয়ার। কারণ, প্রযুক্তির অগ্রগতি তখনই প্রকৃত অর্থে কল্যাণ বয়ে আনবে, যখন তার রাশ থাকবে মানুষের হাতে এবং তা নিশ্চিত করবে পুরো মানবসভ্যতার নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা।
