শেরপুর | ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে শত শত শিক্ষার্থীর মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন তিনি। শিক্ষকতার পাশাপাশি বছরের পর বছর স্থানীয় মসজিদে ইমামতিও করেছেন। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই প্রবীণ শিক্ষক শামছুল হক ক্বারির দিন কাটছে অনাহার-অর্ধাহারে।
শেরপুর সদর উপজেলার ধলা ইউনিয়নের চাঁন্দেরনগর মুসলিম পাড়ায় জরাজীর্ণ একটি ঘরে বসবাস করছেন ৮৮ বছর বয়সী শামছুল হক ক্বারি ও তার ৭৫ বছর বয়সী স্ত্রী রেজিয়া বেগম। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই দম্পতির শেষ আশ্রয়টুকুও এখন ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে।
সাংসারিক জীবনে তাদের তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। তবে সন্তানরা বৃদ্ধ মা-বাবার নিয়মিত খোঁজখবর রাখেন না বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এমনকি বড় ছেলে বাড়ি বিক্রির টাকা নেওয়ার পরও বাবা-মায়ের কাছে আসেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সন্তানদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করতে চান না শামছুল হক ক্বারি ও রেজিয়া বেগম। চোখে জল নিয়ে তারা শুধু বলেন, “আল্লাহ তাদের ভালো রাখুন।”
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শামছুল হক ক্বারি চাঁন্দেরনগর কোহাকান্দা এম.আর. দাখিল মাদরাসায় টানা ৩৫ বছর শিক্ষকতা করেছেন। ২০১৩ সালে অবসরে যান তিনি। শিক্ষকতার পাশাপাশি দীর্ঘদিন স্থানীয় একটি মসজিদে ইমামতির দায়িত্বও পালন করেছেন।
অভাব-অনটনের সংসারে একসময় আবাদি জমি বিক্রি করতে হয় তাকে। পরে জীবিকার তাগিদে ভিটেমাটিও বিক্রি করেন। বর্তমানে যে ব্যক্তি তাদের বাড়ির জায়গাটি কিনেছেন, তার সহানুভূতির কারণেই সেখানে বসবাসের সুযোগ পাচ্ছেন এই প্রবীণ দম্পতি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দুই কক্ষের ঘরটির একটি অংশ ইতোমধ্যেই ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। অন্য কক্ষটিও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। চালের বিভিন্ন অংশ ভেঙে যাওয়ায় বৃষ্টির সময় ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। সামান্য বাতাসেই কেঁপে ওঠে পুরো ঘর। যেকোনো সময় ঘরটি ধসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
একই ঘরের এক পাশে তাদের বসবাস, অন্য পাশে মেঝেতে চুলা বসিয়ে রান্না করেন রেজিয়া বেগম। সীমাহীন কষ্টের মধ্যেই চলছে তাদের দৈনন্দিন জীবন।
খাবারের সংকটও নিত্যসঙ্গী। প্রতিবেশীদের ভাষ্য, অনেক সময় একবেলা খাবার জুটলেও দুইবেলা না খেয়েই দিন পার করতে হয় এই দম্পতিকে।
স্থানীয় বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, একজন শিক্ষক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে শামছুল হক ক্বারি এলাকায় অত্যন্ত সম্মানিত ছিলেন। জীবনের শেষ সময়ে তার এমন অসহায় অবস্থা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টদের এই প্রবীণ দম্পতির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল আলিম ও জুলহাস উদ্দিন বলেন, একসময় যিনি মানুষকে নৈতিকতা, মানবতা ও কোরআনের শিক্ষা দিয়েছেন, আজ তিনিই জীবনের শেষ সময়ে অন্যের সহানুভূতির ওপর নির্ভরশীল। একটি নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত খাবার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে জীবনের বাকি দিনগুলো কিছুটা স্বস্তিতে কাটাতে পারবেন এই প্রবীণ দম্পতি।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, বৃদ্ধ শামছুল হকের বিষয়ে তিনি অবগত হয়েছেন। এরই মধ্যে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বৃদ্ধ দম্পতির ঘরটি মেরামত করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একইসঙ্গে শামছুল হকের জন্য বয়স্ক ভাতার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
৩৫ বছর ধরে শিক্ষার আলো ছড়ানো এই প্রবীণ শিক্ষকের জীবনের শেষ অধ্যায়ে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত খাবার ও মানবিক সহায়তা। প্রশাসনের উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের সামর্থ্যবান মানুষও এগিয়ে এলে হয়তো শেষ বয়সে একটু স্বস্তি ফিরে পেতে পারেন শামছুল হক ক্বারি ও তার স্ত্রী রেজিয়া বেগম।
মোহাম্মদ মাহামুদুল /ওয়ান নিউজ এক্সপ্রেস
গড় রেটিং: ০/৫ (০ ভোট)
ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৩ পূর্বাহ্ণ
শেরপুর | ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে শত শত শিক্ষার্থীর মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন তিনি। শিক্ষকতার পাশাপাশি বছরের পর বছর স্থানীয় মসজিদে ইমামতিও করেছেন। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই প্রবীণ শিক্ষক শামছুল হক ক্বারির দিন কাটছে অনাহার-অর্ধাহারে।
শেরপুর সদর উপজেলার ধলা ইউনিয়নের চাঁন্দেরনগর মুসলিম পাড়ায় জরাজীর্ণ একটি ঘরে বসবাস করছেন ৮৮ বছর বয়সী শামছুল হক ক্বারি ও তার ৭৫ বছর বয়সী স্ত্রী রেজিয়া বেগম। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই দম্পতির শেষ আশ্রয়টুকুও এখন ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে।
সাংসারিক জীবনে তাদের তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। তবে সন্তানরা বৃদ্ধ মা-বাবার নিয়মিত খোঁজখবর রাখেন না বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এমনকি বড় ছেলে বাড়ি বিক্রির টাকা নেওয়ার পরও বাবা-মায়ের কাছে আসেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সন্তানদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করতে চান না শামছুল হক ক্বারি ও রেজিয়া বেগম। চোখে জল নিয়ে তারা শুধু বলেন, “আল্লাহ তাদের ভালো রাখুন।”
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শামছুল হক ক্বারি চাঁন্দেরনগর কোহাকান্দা এম.আর. দাখিল মাদরাসায় টানা ৩৫ বছর শিক্ষকতা করেছেন। ২০১৩ সালে অবসরে যান তিনি। শিক্ষকতার পাশাপাশি দীর্ঘদিন স্থানীয় একটি মসজিদে ইমামতির দায়িত্বও পালন করেছেন।
অভাব-অনটনের সংসারে একসময় আবাদি জমি বিক্রি করতে হয় তাকে। পরে জীবিকার তাগিদে ভিটেমাটিও বিক্রি করেন। বর্তমানে যে ব্যক্তি তাদের বাড়ির জায়গাটি কিনেছেন, তার সহানুভূতির কারণেই সেখানে বসবাসের সুযোগ পাচ্ছেন এই প্রবীণ দম্পতি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দুই কক্ষের ঘরটির একটি অংশ ইতোমধ্যেই ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। অন্য কক্ষটিও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। চালের বিভিন্ন অংশ ভেঙে যাওয়ায় বৃষ্টির সময় ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। সামান্য বাতাসেই কেঁপে ওঠে পুরো ঘর। যেকোনো সময় ঘরটি ধসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
একই ঘরের এক পাশে তাদের বসবাস, অন্য পাশে মেঝেতে চুলা বসিয়ে রান্না করেন রেজিয়া বেগম। সীমাহীন কষ্টের মধ্যেই চলছে তাদের দৈনন্দিন জীবন।
খাবারের সংকটও নিত্যসঙ্গী। প্রতিবেশীদের ভাষ্য, অনেক সময় একবেলা খাবার জুটলেও দুইবেলা না খেয়েই দিন পার করতে হয় এই দম্পতিকে।
স্থানীয় বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, একজন শিক্ষক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে শামছুল হক ক্বারি এলাকায় অত্যন্ত সম্মানিত ছিলেন। জীবনের শেষ সময়ে তার এমন অসহায় অবস্থা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টদের এই প্রবীণ দম্পতির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল আলিম ও জুলহাস উদ্দিন বলেন, একসময় যিনি মানুষকে নৈতিকতা, মানবতা ও কোরআনের শিক্ষা দিয়েছেন, আজ তিনিই জীবনের শেষ সময়ে অন্যের সহানুভূতির ওপর নির্ভরশীল। একটি নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত খাবার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে জীবনের বাকি দিনগুলো কিছুটা স্বস্তিতে কাটাতে পারবেন এই প্রবীণ দম্পতি।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, বৃদ্ধ শামছুল হকের বিষয়ে তিনি অবগত হয়েছেন। এরই মধ্যে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বৃদ্ধ দম্পতির ঘরটি মেরামত করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একইসঙ্গে শামছুল হকের জন্য বয়স্ক ভাতার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
৩৫ বছর ধরে শিক্ষার আলো ছড়ানো এই প্রবীণ শিক্ষকের জীবনের শেষ অধ্যায়ে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত খাবার ও মানবিক সহায়তা। প্রশাসনের উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের সামর্থ্যবান মানুষও এগিয়ে এলে হয়তো শেষ বয়সে একটু স্বস্তি ফিরে পেতে পারেন শামছুল হক ক্বারি ও তার স্ত্রী রেজিয়া বেগম।
মোহাম্মদ মাহামুদুল /ওয়ান নিউজ এক্সপ্রেস
