গত কয়েক বছরে দেশে মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ইয়াবা, আইস, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক সহজে পৌঁছে যাচ্ছে তরুণদের হাতে। সীমান্তপথে চোরাচালান, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র, প্রযুক্তিনির্ভর মাদক বাণিজ্য এবং সামাজিক অবক্ষয়ের সুযোগ নিয়ে এই ভয়াবহ ব্যবসা আরও বিস্তৃত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের তরুণ সমাজ—যারা আগামী দিনের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা।
মাদকাসক্তি শুধু ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নষ্ট করে না; এটি অপরাধপ্রবণতাও বাড়িয়ে দেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, বহু সহিংস ও সম্পদসংক্রান্ত অপরাধের সঙ্গে মাদকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। পরিবারে অশান্তি, কিশোর অপরাধ, সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মক্ষেত্রে অনিয়ম এবং সামাজিক অস্থিরতার পেছনেও মাদকের প্রভাব প্রায়ই দৃশ্যমান। ফলে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই মানে কেবল মাদক উদ্ধার নয়; এটি একটি নিরাপদ সমাজ গড়ার সংগ্রাম।
সরকার নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও সক্রিয়। কিন্তু কেবল অভিযান দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মাদকের সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে দিতে হবে, সীমান্ত নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করতে হবে, মাদক কারবারিদের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে হবে এবং বিচারব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা অর্থনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আইনের বাইরে থাকতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যম—সবার দায়িত্ব সমান গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কী ধরনের মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী শিক্ষা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে তরুণদের জন্য ইতিবাচক বিকল্প তৈরি হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পুনর্বাসন। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের কেবল অপরাধী হিসেবে দেখলে চলবে না। যারা চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান, তাদের জন্য উন্নত পুনর্বাসনব্যবস্থা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। কারণ একজন মানুষকে ফিরিয়ে আনা মানে একটি পরিবারকে বাঁচানো; আর একটি পরিবারকে বাঁচানো মানে একটি সমাজকে রক্ষা করা।
গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্বশীল সংবাদ প্রকাশ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, জনসচেতনতামূলক প্রচারণা এবং মাদকচক্রের বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থের ক্ষমতা কিংবা অন্য কোনো বিবেচনায় মাদকবিরোধী অবস্থান দুর্বল করা চলবে না। এই প্রশ্নে আপসের সুযোগ নেই।
একটি সভ্য জাতির শক্তি তার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। সেই প্রজন্ম যদি মাদকের অন্ধকারে হারিয়ে যায়, তবে উন্নয়ন, অবকাঠামো কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অর্জনও অর্থহীন হয়ে পড়বে। তাই মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করতে হবে। রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার এবং প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
মাদকের বিরুদ্ধে নীরবতা কোনো সমাধান নয়; প্রতিরোধই একমাত্র পথ।
আজকের সচেতনতা, কঠোরতা ও সম্মিলিত উদ্যোগই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্ম একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ পাবে কি না।
— সম্পাদকীয় বিভাগ
OneNewsExpress
গড় রেটিং: ০/৫ (০ ভোট)
ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৩:১৩ অপরাহ্ণ
গত কয়েক বছরে দেশে মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ইয়াবা, আইস, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক সহজে পৌঁছে যাচ্ছে তরুণদের হাতে। সীমান্তপথে চোরাচালান, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র, প্রযুক্তিনির্ভর মাদক বাণিজ্য এবং সামাজিক অবক্ষয়ের সুযোগ নিয়ে এই ভয়াবহ ব্যবসা আরও বিস্তৃত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের তরুণ সমাজ—যারা আগামী দিনের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা।
মাদকাসক্তি শুধু ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নষ্ট করে না; এটি অপরাধপ্রবণতাও বাড়িয়ে দেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, বহু সহিংস ও সম্পদসংক্রান্ত অপরাধের সঙ্গে মাদকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। পরিবারে অশান্তি, কিশোর অপরাধ, সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মক্ষেত্রে অনিয়ম এবং সামাজিক অস্থিরতার পেছনেও মাদকের প্রভাব প্রায়ই দৃশ্যমান। ফলে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই মানে কেবল মাদক উদ্ধার নয়; এটি একটি নিরাপদ সমাজ গড়ার সংগ্রাম।
সরকার নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও সক্রিয়। কিন্তু কেবল অভিযান দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মাদকের সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে দিতে হবে, সীমান্ত নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করতে হবে, মাদক কারবারিদের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে হবে এবং বিচারব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা অর্থনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আইনের বাইরে থাকতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যম—সবার দায়িত্ব সমান গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কী ধরনের মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী শিক্ষা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে তরুণদের জন্য ইতিবাচক বিকল্প তৈরি হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পুনর্বাসন। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের কেবল অপরাধী হিসেবে দেখলে চলবে না। যারা চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান, তাদের জন্য উন্নত পুনর্বাসনব্যবস্থা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। কারণ একজন মানুষকে ফিরিয়ে আনা মানে একটি পরিবারকে বাঁচানো; আর একটি পরিবারকে বাঁচানো মানে একটি সমাজকে রক্ষা করা।
গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্বশীল সংবাদ প্রকাশ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, জনসচেতনতামূলক প্রচারণা এবং মাদকচক্রের বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থের ক্ষমতা কিংবা অন্য কোনো বিবেচনায় মাদকবিরোধী অবস্থান দুর্বল করা চলবে না। এই প্রশ্নে আপসের সুযোগ নেই।
একটি সভ্য জাতির শক্তি তার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। সেই প্রজন্ম যদি মাদকের অন্ধকারে হারিয়ে যায়, তবে উন্নয়ন, অবকাঠামো কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অর্জনও অর্থহীন হয়ে পড়বে। তাই মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করতে হবে। রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার এবং প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
মাদকের বিরুদ্ধে নীরবতা কোনো সমাধান নয়; প্রতিরোধই একমাত্র পথ।
আজকের সচেতনতা, কঠোরতা ও সম্মিলিত উদ্যোগই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্ম একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ পাবে কি না।
— সম্পাদকীয় বিভাগ
OneNewsExpress
