তথ্যের ঘাটতি ও দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য
মরদেহ সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকায় রয়েছে—পাসপোর্টের ফটোকপি, মৃত্যু সনদ, বাংলাদেশ দূতাবাসের এনওসি (NOC) এবং এয়ারওয়েজ বিলের মূলকপি। কিন্তু প্রক্রিয়ার জটিলতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায়, অনেক পরিবারই প্রয়োজনীয় নথিপত্র ছাড়াই বিমানবন্দরে পৌঁছান। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, "সচেতনতার অভাবের সুযোগ নেয় দুর্নীতিবাজ একটি চক্র। সামান্য পরামর্শ বা তথ্যের বিনিময়েও তারা স্বজনদের কাছ থেকে অনৈতিকভাবে অর্থ হাতিয়ে নেয়। ওয়ারিশ সনদ বা স্থানীয় কোনো সনদের অভাবে পরিবারগুলো যখন অসহায় বোধ করে, তখন এই চক্রটি দালালি করে বাড়তি অর্থ আদায়ের ফাঁদ পাতে।"
দূতাবাসের ভূমিকা ও এয়ারলাইন্সের জটিলতা
বিদেশের মাটিতে কোনো বাংলাদেশির মৃত্যুর পর মরদেহ ফেরত আনা কেবল একটি দেশের আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়ম-কানুন ও এয়ারলাইন্সের চাহিদাও পূরণ করতে হয়। অনেক সময় এয়ারলাইন্সগুলো মরদেহ পরিবহন করতে অনাগ্রহ দেখায়। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক মোঃ আসাদুজ্জামান জানান, "মৃত্যুবরণকারীর পাসপোর্ট নম্বর জানালে সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসের লেবার উইংয়ের মাধ্যমে আমরা সর্বোচ্চ সহায়তা করি। এনওসি থেকে শুরু করে দ্রুততম সময়ের ফ্লাইটে মরদেহ পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়াটি দূতাবাস তদারকি করে।"
একটি দুঃসহ স্মৃতির বয়ান
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের নুর ইসলাম তার ভায়রা ওমর ফারুকের মৃত্যুর পর যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলেন, তা হাজারো প্রবাসীর পরিবারের বাস্তব চিত্র। রিয়াদে মৃত্যুর কয়েকদিন পর খবর পাওয়া এবং মরদেহ কোথায় আছে—তা খুঁজে বের করতেই কেটে গিয়েছিল দীর্ঘ সময়। নুর ইসলাম বলেন, "লাশ কোথায় আছে সেই খোঁজ পেতেই আমাদের কয়েকটা দিন কেটে যায়। এরপর কীভাবে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে, তা জানা ছিল না। পরে গণমাধ্যমকর্মীদের সহযোগিতায় দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করে মরদেহ আনার ব্যবস্থা করি। সেই কয়েকটা দিন যে কী কষ্টের ছিল, তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়।"
আইনি জটিলতা ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়া
আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, একজন প্রবাসীর মরদেহ দেশে আনার জন্য নির্দিষ্ট ধাপ অনুসরণ করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে:
১. সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের অনুমতি।
২. স্থানীয় হাসপাতাল ও পুলিশের নথিপত্র।
৩. এমবামিং সার্টিফিকেট (অনুমোদিত ফিউনারেল হোম কর্তৃক)।
৪. এয়ারলাইন্সের অনুমোদন ও কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স।
বর্তমানে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছাড়াও চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দরে মরদেহ গ্রহণের ব্যবস্থা রয়েছে। এয়ারপোর্ট কাস্টমস ও স্বাস্থ্য বিভাগের ক্লিয়ারেন্সের পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পরিসংখ্যান ও বর্তমান পরিস্থিতি
২০২৪ সালে মোট ৪,৮১৩ জন এবং ২০২৩ সালে ৪,৫৫২ জন প্রবাসী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। সংখ্যার এই ঊর্ধ্বগতি নির্দেশ করে যে, মরদেহ গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি। বিমানবন্দরে মরদেহ গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও মানবিক, হয়রানিমুক্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও অভিবাসন বিশ্লেষকরা।
গড় রেটিং: ০/৫ (০ ভোট)
ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৩ পূর্বাহ্ণ
তথ্যের ঘাটতি ও দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য
মরদেহ সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকায় রয়েছে—পাসপোর্টের ফটোকপি, মৃত্যু সনদ, বাংলাদেশ দূতাবাসের এনওসি (NOC) এবং এয়ারওয়েজ বিলের মূলকপি। কিন্তু প্রক্রিয়ার জটিলতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায়, অনেক পরিবারই প্রয়োজনীয় নথিপত্র ছাড়াই বিমানবন্দরে পৌঁছান। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, "সচেতনতার অভাবের সুযোগ নেয় দুর্নীতিবাজ একটি চক্র। সামান্য পরামর্শ বা তথ্যের বিনিময়েও তারা স্বজনদের কাছ থেকে অনৈতিকভাবে অর্থ হাতিয়ে নেয়। ওয়ারিশ সনদ বা স্থানীয় কোনো সনদের অভাবে পরিবারগুলো যখন অসহায় বোধ করে, তখন এই চক্রটি দালালি করে বাড়তি অর্থ আদায়ের ফাঁদ পাতে।"
দূতাবাসের ভূমিকা ও এয়ারলাইন্সের জটিলতা
বিদেশের মাটিতে কোনো বাংলাদেশির মৃত্যুর পর মরদেহ ফেরত আনা কেবল একটি দেশের আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়ম-কানুন ও এয়ারলাইন্সের চাহিদাও পূরণ করতে হয়। অনেক সময় এয়ারলাইন্সগুলো মরদেহ পরিবহন করতে অনাগ্রহ দেখায়। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক মোঃ আসাদুজ্জামান জানান, "মৃত্যুবরণকারীর পাসপোর্ট নম্বর জানালে সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসের লেবার উইংয়ের মাধ্যমে আমরা সর্বোচ্চ সহায়তা করি। এনওসি থেকে শুরু করে দ্রুততম সময়ের ফ্লাইটে মরদেহ পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়াটি দূতাবাস তদারকি করে।"
একটি দুঃসহ স্মৃতির বয়ান
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের নুর ইসলাম তার ভায়রা ওমর ফারুকের মৃত্যুর পর যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলেন, তা হাজারো প্রবাসীর পরিবারের বাস্তব চিত্র। রিয়াদে মৃত্যুর কয়েকদিন পর খবর পাওয়া এবং মরদেহ কোথায় আছে—তা খুঁজে বের করতেই কেটে গিয়েছিল দীর্ঘ সময়। নুর ইসলাম বলেন, "লাশ কোথায় আছে সেই খোঁজ পেতেই আমাদের কয়েকটা দিন কেটে যায়। এরপর কীভাবে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে, তা জানা ছিল না। পরে গণমাধ্যমকর্মীদের সহযোগিতায় দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করে মরদেহ আনার ব্যবস্থা করি। সেই কয়েকটা দিন যে কী কষ্টের ছিল, তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়।"
আইনি জটিলতা ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়া
আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, একজন প্রবাসীর মরদেহ দেশে আনার জন্য নির্দিষ্ট ধাপ অনুসরণ করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে:
১. সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের অনুমতি।
২. স্থানীয় হাসপাতাল ও পুলিশের নথিপত্র।
৩. এমবামিং সার্টিফিকেট (অনুমোদিত ফিউনারেল হোম কর্তৃক)।
৪. এয়ারলাইন্সের অনুমোদন ও কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স।
বর্তমানে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছাড়াও চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দরে মরদেহ গ্রহণের ব্যবস্থা রয়েছে। এয়ারপোর্ট কাস্টমস ও স্বাস্থ্য বিভাগের ক্লিয়ারেন্সের পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পরিসংখ্যান ও বর্তমান পরিস্থিতি
২০২৪ সালে মোট ৪,৮১৩ জন এবং ২০২৩ সালে ৪,৫৫২ জন প্রবাসী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। সংখ্যার এই ঊর্ধ্বগতি নির্দেশ করে যে, মরদেহ গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি। বিমানবন্দরে মরদেহ গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও মানবিক, হয়রানিমুক্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও অভিবাসন বিশ্লেষকরা।
