রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬
ONE NEWS EXPRESS

দিল্লির ফুটপাতে অনিরাপদ রাত: গৃহহীন নারীদের জন্য বেঁচে থাকাই যখন চরম লড়াই ​নিজস্ব প্রতিবেদক দিল্লি


মোঃ সোহেল
মোঃ সোহেল বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ : রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ১২:১১ অপরাহ্ণ | প্রিন্ট | ডাউনলোড কার্ড

দিল্লির ফুটপাতে অনিরাপদ রাত: গৃহহীন নারীদের জন্য বেঁচে থাকাই যখন চরম লড়াই  ​নিজস্ব প্রতিবেদক  দিল্লি

​ভারতের রাজধানী দিল্লির মেহরৌলি এলাকায় গত ২২ জুন দশ বছর বয়সী এক শিশুকন্যাকে অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাটি পুরো দেশে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। একটি মেট্রো স্টেশনের ফুটপাতে ঘুমন্ত অবস্থায় থাকা শিশুটিকে তুলে নিয়ে গিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনা ফের উন্মোচন করে দিয়েছে দিল্লির অন্ধকার এক বাস্তবতাকে—যেখানে মাথার ওপর ছাদ না থাকা লক্ষাধিক মানুষের জন্য প্রতিটি রাতই একটি চরম অনিশ্চয়তা ও প্রাণহানির ঝুঁকি।

​অদৃশ্য জীবনের পরিসংখ্যান:

​রোজগারের আশায় ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিনিয়ত মানুষ দিল্লিতে ভিড় করে। তাদের একটি বড় অংশ আবাসন সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে ফুটপাত, ফ্লাইওভারের নিচে বা রাস্তার ধারে রাত কাটান। দিল্লির গৃহহীনদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘শহরি অধিকার মঞ্চ’-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দিল্লিতে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা প্রায় তিন লাখ। সময়ের সঙ্গে এই সংখ্যা বেড়েই চলেছে, যার একটি বড় অংশই নারী ও শিশু। সরকারিভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান না থাকায় তারা রাষ্ট্রীয় সেবার আওতা থেকেও প্রায়শই বঞ্চিত থেকে যান।

​রাতের ভয়: শ্লীলতাহানি থেকে মৃত্যু:

​রাস্তায় রাত কাটানো এই মানুষদের কাছে বিরূপ আবহাওয়া বা দ্রুতগামী যানবাহনের ঝুঁকি বড় কোনো সমস্যা নয়; তাদের নিত্যদিনের প্রধান আতঙ্ক হলো যৌন সহিংসতা ও অপহরণ। ভুক্তভোগী অনেক নারী জানিয়েছেন, তারা কখনোই নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন না। রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে এলে তাদের চোখ থাকে খোলা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বলেন, "জঙ্গলে থাকার চেয়েও এই শহরে মেয়ে সন্তানকে নিয়ে রাস্তায় ঘুমানো বেশি ভয়ংকর।"

​সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রের সংকট:

​দিল্লিতে সরকারিভাবে বেশ কিছু 'নাইট শেল্টার' বা রাত্রিকালীন আশ্রয়কেন্দ্র থাকলেও, বাস্তবের চিত্র ভিন্ন। গৃহহীন নারীদের একটি বড় অংশ সেখানে যেতে অনিচ্ছুক। এর পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো:

​অপরিচ্ছন্নতা ও অপর্যাপ্ততা: অধিকাংশ আশ্রয়কেন্দ্রে শৌচাগার ও পানীয় জলের অভাব প্রকট।

​অবস্থানগত সমস্যা: আশ্রয়কেন্দ্রগুলো কাজের জায়গা থেকে অনেক দূরে হওয়ায় দিনমজুররা সেখানে যেতে আগ্রহী হন না।

​নিরাপত্তাহীনতা ও নথিপত্রের জটিলতা: অনেক ক্ষেত্রে পরিচয়পত্রের বাধ্যবাধকতা এবং কেন্দ্রের ভেতরেও নিরাপত্তার অভাব থাকায় তারা রাস্তার খোলা আকাশকেই বেশি নিরাপদ মনে করেন।

​সমাজকর্মীদের পর্যবেক্ষণ ও করণীয়:

​‘শহরি অধিকার মঞ্চ’সহ মানবাধিকার কর্মীদের মতে, কেবল আইন দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। তাদের প্রস্তাবিত কিছু জরুরি পদক্ষেপ হলো:

​১. নিরাপদ ও সংরক্ষিত স্থান: শুধুমাত্র নারী ও শিশুদের জন্য কঠোর নজরদারিযুক্ত (সিসিটিভি ও নারী রক্ষীবেষ্টিত) আশ্রয়কেন্দ্র নিশ্চিত করা।

২. সামাজিক সুরক্ষা: গৃহহীনদের 'অবৈধ দখলদার' হিসেবে না দেখে তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী সরকারি আবাসন প্রকল্প গ্রহণ করা।

৩. জরুরি হেল্পলাইন: গৃহহীনদের জন্য বিশেষ হেল্পলাইন নম্বর চালু করা, যাতে বিপদের সময় দ্রুত সহায়তা পাওয়া সম্ভব হয়।

৪. ভ্রাম্যমাণ টহল: ফুটপাত বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় রাতের বেলা পুলিশি টহলের পরিধি বাড়ানো।

​উপসংহার:

​মেহরৌলির ঘটনার পর অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হলেও, প্রশ্ন উঠেছে নগর পরিকল্পনা ও সামাজিক নিরাপত্তার ব্যর্থতা নিয়ে। সমাজকর্মীদের মতে, "একটি আধুনিক শহর তখনই উন্নত বলা যায়, যখন সেই শহরের সবচেয়ে দুর্বল মানুষটিও রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে।" ফুটপাতে বসবাসকারী এই মানুষগুলোর কাছে প্রতিটি রাত এক অনিশ্চিত যুদ্ধ। এই যুদ্ধ থামাতে কেবল আইনি পদক্ষেপ নয়, প্রয়োজন রাষ্ট্রের মানবিক ও কাঠামোগত উদ্যোগ।

​তথ্যসূত্র:

​‘শহরি অধিকার মঞ্চ’ প্রতিবেদন (২০২৪)

​সাম্প্রতিক গণমাধ্যম প্রতিবেদন (মেহরৌলি হত্যাকাণ্ড)

এই সংবাদটি আপনার কেমন লেগেছে?


খবরটি রেটিং দিন

গড় রেটিং: /৫ ( ভোট)

ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

ONE NEWS EXPRESS

রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬


দিল্লির ফুটপাতে অনিরাপদ রাত: গৃহহীন নারীদের জন্য বেঁচে থাকাই যখন চরম লড়াই ​নিজস্ব প্রতিবেদক দিল্লি

প্রকাশের তারিখ : রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ১২:১১ অপরাহ্ণ

featured Image

​ভারতের রাজধানী দিল্লির মেহরৌলি এলাকায় গত ২২ জুন দশ বছর বয়সী এক শিশুকন্যাকে অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাটি পুরো দেশে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। একটি মেট্রো স্টেশনের ফুটপাতে ঘুমন্ত অবস্থায় থাকা শিশুটিকে তুলে নিয়ে গিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনা ফের উন্মোচন করে দিয়েছে দিল্লির অন্ধকার এক বাস্তবতাকে—যেখানে মাথার ওপর ছাদ না থাকা লক্ষাধিক মানুষের জন্য প্রতিটি রাতই একটি চরম অনিশ্চয়তা ও প্রাণহানির ঝুঁকি।

​অদৃশ্য জীবনের পরিসংখ্যান:

​রোজগারের আশায় ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিনিয়ত মানুষ দিল্লিতে ভিড় করে। তাদের একটি বড় অংশ আবাসন সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে ফুটপাত, ফ্লাইওভারের নিচে বা রাস্তার ধারে রাত কাটান। দিল্লির গৃহহীনদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘শহরি অধিকার মঞ্চ’-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দিল্লিতে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা প্রায় তিন লাখ। সময়ের সঙ্গে এই সংখ্যা বেড়েই চলেছে, যার একটি বড় অংশই নারী ও শিশু। সরকারিভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান না থাকায় তারা রাষ্ট্রীয় সেবার আওতা থেকেও প্রায়শই বঞ্চিত থেকে যান।

​রাতের ভয়: শ্লীলতাহানি থেকে মৃত্যু:

​রাস্তায় রাত কাটানো এই মানুষদের কাছে বিরূপ আবহাওয়া বা দ্রুতগামী যানবাহনের ঝুঁকি বড় কোনো সমস্যা নয়; তাদের নিত্যদিনের প্রধান আতঙ্ক হলো যৌন সহিংসতা ও অপহরণ। ভুক্তভোগী অনেক নারী জানিয়েছেন, তারা কখনোই নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন না। রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে এলে তাদের চোখ থাকে খোলা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বলেন, "জঙ্গলে থাকার চেয়েও এই শহরে মেয়ে সন্তানকে নিয়ে রাস্তায় ঘুমানো বেশি ভয়ংকর।"

​সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রের সংকট:

​দিল্লিতে সরকারিভাবে বেশ কিছু 'নাইট শেল্টার' বা রাত্রিকালীন আশ্রয়কেন্দ্র থাকলেও, বাস্তবের চিত্র ভিন্ন। গৃহহীন নারীদের একটি বড় অংশ সেখানে যেতে অনিচ্ছুক। এর পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো:

​অপরিচ্ছন্নতা ও অপর্যাপ্ততা: অধিকাংশ আশ্রয়কেন্দ্রে শৌচাগার ও পানীয় জলের অভাব প্রকট।

​অবস্থানগত সমস্যা: আশ্রয়কেন্দ্রগুলো কাজের জায়গা থেকে অনেক দূরে হওয়ায় দিনমজুররা সেখানে যেতে আগ্রহী হন না।

​নিরাপত্তাহীনতা ও নথিপত্রের জটিলতা: অনেক ক্ষেত্রে পরিচয়পত্রের বাধ্যবাধকতা এবং কেন্দ্রের ভেতরেও নিরাপত্তার অভাব থাকায় তারা রাস্তার খোলা আকাশকেই বেশি নিরাপদ মনে করেন।

​সমাজকর্মীদের পর্যবেক্ষণ ও করণীয়:

​‘শহরি অধিকার মঞ্চ’সহ মানবাধিকার কর্মীদের মতে, কেবল আইন দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। তাদের প্রস্তাবিত কিছু জরুরি পদক্ষেপ হলো:

​১. নিরাপদ ও সংরক্ষিত স্থান: শুধুমাত্র নারী ও শিশুদের জন্য কঠোর নজরদারিযুক্ত (সিসিটিভি ও নারী রক্ষীবেষ্টিত) আশ্রয়কেন্দ্র নিশ্চিত করা।

২. সামাজিক সুরক্ষা: গৃহহীনদের 'অবৈধ দখলদার' হিসেবে না দেখে তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী সরকারি আবাসন প্রকল্প গ্রহণ করা।

৩. জরুরি হেল্পলাইন: গৃহহীনদের জন্য বিশেষ হেল্পলাইন নম্বর চালু করা, যাতে বিপদের সময় দ্রুত সহায়তা পাওয়া সম্ভব হয়।

৪. ভ্রাম্যমাণ টহল: ফুটপাত বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় রাতের বেলা পুলিশি টহলের পরিধি বাড়ানো।

​উপসংহার:

​মেহরৌলির ঘটনার পর অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হলেও, প্রশ্ন উঠেছে নগর পরিকল্পনা ও সামাজিক নিরাপত্তার ব্যর্থতা নিয়ে। সমাজকর্মীদের মতে, "একটি আধুনিক শহর তখনই উন্নত বলা যায়, যখন সেই শহরের সবচেয়ে দুর্বল মানুষটিও রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে।" ফুটপাতে বসবাসকারী এই মানুষগুলোর কাছে প্রতিটি রাত এক অনিশ্চিত যুদ্ধ। এই যুদ্ধ থামাতে কেবল আইনি পদক্ষেপ নয়, প্রয়োজন রাষ্ট্রের মানবিক ও কাঠামোগত উদ্যোগ।

​তথ্যসূত্র:

​‘শহরি অধিকার মঞ্চ’ প্রতিবেদন (২০২৪)

​সাম্প্রতিক গণমাধ্যম প্রতিবেদন (মেহরৌলি হত্যাকাণ্ড)


ONE NEWS EXPRESS

সম্পাদক ও প্রকাশক- মো: মনিরুজ্জামান
সহ-সম্পাদক: তুহিন আহসান
বার্তা সম্পাদক: তামিমা জান্নাত

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
দিল্লির ফুটপাতে অনিরাপদ রাত: গৃহহীন নারীদের জন্য বেঁচে থাকাই যখন চরম লড়াই ​নিজস্ব প্রতিবেদক দিল্লি
0:00 / 0:00
1x