ময়মনসিংহের ত্রিশালে পৌর মহিলা বিপণি কেন্দ্রের আটটি দোকান থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে পৌর কোষাগারে কম টাকা জমা দেওয়া, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বইমেলার কাজে ব্যবহৃত ইট নিজ বাসায় নিয়ে যাওয়া, টিআর, কাবিখাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ১০ থেকে ২০ শতাংশ কমিশন আদায়, নিয়োগ ও টেন্ডার বাণিজ্যসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে ত্রিশাল পৌরসভার প্রধান সহকারী এছাহাক আলীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, এসব অনিয়মের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন এবং পৌরসভার বিভিন্ন সুবিধা ব্যক্তিগতভাবে ভোগ করছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ময়মনসিংহের ত্রিশাল পৌরসভার তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়েও এছাহাক আলী বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে পৌর প্রশাসকের আস্থাভাজন হিসেবে কাজ করার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম করে আসছেন।
অভিযোগ রয়েছে, গত ৫ আগস্টের পর পৌর মহিলা বিপণি কেন্দ্রের আটটি দোকানের প্রতিটি থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে আদায় করলেও পৌর কোষাগারে জমা দেওয়া হয় মাত্র ৩০০ টাকা করে। বাকি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এছাড়া পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ১০ থেকে ২০ শতাংশ কমিশন আদায়, নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য এবং বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের সঙ্গেও তিনি জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের চরপাড়া এলাকায় প্রায় তিন শতক জমির ওপর পাঁচতলা ভিতবিশিষ্ট একটি আলিশান ভবন নির্মাণ করেছেন এছাহাক আলী। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ৩২ লাখ টাকা দিয়ে জমি কিনে সেখানে কোটি টাকা ব্যয়ে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, ব্যক্তিগত সুবিধার্থে পৌরসভার অর্থায়নে তাঁর বাড়ি পর্যন্ত সিসি ঢালাই সড়ক নির্মাণ, ভবনের সামনে সোলার স্ট্রিট লাইট স্থাপন এবং প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয়ে পৃথক ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া তাঁর বাসায় একাধিক অবৈধ গ্যাস সংযোগ ব্যবহারের অভিযোগও স্থানীয়দের মধ্যে রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, পৌরসভার একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর পক্ষে কীভাবে এত সম্পদের মালিক হওয়া এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যক্তিগতভাবে ভোগ করা সম্ভব হলো।
পৌর প্রকৌশল দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয় রোড থেকে সালাম সাহেবের বাসা পর্যন্ত সিসি সড়ক নির্মাণে ১ লাখ ৬৮ হাজার ১৯৪ টাকা এবং ৩ নম্বর ওয়ার্ডে পৌর কর্মচারী এছাহাক আলীর বাসার সামনে আরসিসি স্ল্যাবসহ ড্রেন নির্মাণে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৬৬৯ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, এই দুটি প্রকল্পই মূলত তাঁর বাসাকেন্দ্রিক।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে নজরুল একাডেমির মাঠে ইটের সলিং নির্মাণে রাজস্ব খাত থেকে প্রায় আড়াই লাখ টাকা ব্যয় করা হলেও অনুষ্ঠান শেষে সেই ইট খুলে নিজের বাসায় নিয়ে যান এছাহাক আলী।
সূত্রগুলোর দাবি, পৌরসভার বিভিন্ন দপ্তরের কাজে তিনি ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন। একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়েও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও প্রকল্প বাস্তবায়নে তাঁর ভূমিকা নিয়ে পৌরসভার অভ্যন্তরে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, নির্বাচিত মেয়র না থাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের আস্থা অর্জন করে এছাহাক আলী পৌরসভার বিভিন্ন বিষয়ে প্রভাব খাটাচ্ছেন। কেউ তাঁর বিরোধিতা করলে প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়তে হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।
এছাহাক আলীর গ্রামের বাড়ি ত্রিশাল উপজেলার সাখুয়া ইউনিয়নের একটি প্রত্যন্ত এলাকায়। স্থানীয়দের দাবি, কৃষক পরিবারের সন্তান হিসেবে চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তাঁর আর্থিক অবস্থার অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে। বর্তমানে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পৌরসভার একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি তৎকালীন মেয়রদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সরকার পরিবর্তনের পরও নতুন প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখে পৌরসভার বিভিন্ন আর্থিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করছেন। গত দুই বছরে বিভিন্ন টেন্ডার কার্যক্রম, মার্কেটের ভাড়া আদায় এবং উন্নয়ন প্রকল্পে লাখ লাখ টাকার অনিয়মের সঙ্গে তিনি জড়িত বলে অভিযোগ করেন তারা।
অভিযোগ অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর পৌর মহিলা বিপণি কেন্দ্রের দোকানগুলোর ভাড়া আদায় করতেন প্রধান সহকারী এছহাক আলী দোকানপ্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে রিসিট বিহিন ভাড়া আদায় করলেও জমা দেননি। তবে পৌরসভার হিসাবে দোকানপ্রতি জমা হতো মাত্র ৩০০ টাকা করে।
পৌর মহিলা বিপণি কেন্দ্রের দোকানী আজিজুল বলেন, দোকানের সিকিউরিটি বাবদ এছাহাক আলী আমার কাছ থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন। কোন কাগজ পত্র দেন নাই। শুনেছি পৌরসভায় জমা হয়েছে ১ লাখ টাকা।
পৌরসভার সাবেক মহিলা কাউন্সিলর মোছা. নাছিমা পারভীন অভিযোগে বলেন, "এছাহাক আলী তাঁর ক্ষমতার অপব্যবহার করে পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ নিজের নামে বা আত্মীয়-স্বজনের নামে করিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এছাড়া পৌর মার্কেটের দোকান নির্মাণ, ড্রেন নির্মাণ, অফিসের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন কাজে তাঁর একক প্রভাব রয়েছে। ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন আদায় এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে নিজের ইচ্ছামতো কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।"
নাছিমা পারভীন আরও বলেন, "অফিসের ভেতরে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ায় অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পান না। তাঁর কারণে পৌরসভার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আমি তার বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে বিভাগীয় কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।"
পৌরসভার সাবেক ভারপ্রাপ্ত মেয়র আমিনুল ইসলাম খোকন অভিযোগ করে বলেন, "এছাহাক আলী পৌরসভার তৃতীয় শ্রেণির একজন কর্মচারী হলেও বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। নতুন কোনো প্রশাসক যোগ দিলেই তিনি বিভিন্ন প্রকল্প নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।"
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে কয়েকদিন ধরে প্রধান সহকারী এছাহাক আলীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। একদিন তিনি মুঠোফোনে বলেন, "আমি প্রশাসক স্যারের কক্ষে কাজে ব্যস্ত আছি, পরে ফোন দিচ্ছি।" এরপর একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ত্রিশাল পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা নওশিন আহমেদ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, "আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না। আমি অনেক অসুস্থ।" এছাড়া সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বিষয়ে তিনি পৌর প্রকৌশলী এবং সার্বিক বিষয়ে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
ত্রিশাল পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাবেরী জালাল বলেন, "আমি সাত-আট মাসের ছুটি শেষে সম্প্রতি অফিসে যোগদান করেছি। তাই এসব বিষয়ে আমার জানা নেই। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
এছাহাক আলীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে ত্রিশাল পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরাফাত সিদ্দিকীর বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে কল এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও সংবাদ প্রকাশ পর্যন্ত তিনি কোনো সাড়া দেননি।
গড় রেটিং: ০/৫ (০ ভোট)
ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩৬ অপরাহ্ণ
ময়মনসিংহের ত্রিশালে পৌর মহিলা বিপণি কেন্দ্রের আটটি দোকান থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে পৌর কোষাগারে কম টাকা জমা দেওয়া, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বইমেলার কাজে ব্যবহৃত ইট নিজ বাসায় নিয়ে যাওয়া, টিআর, কাবিখাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ১০ থেকে ২০ শতাংশ কমিশন আদায়, নিয়োগ ও টেন্ডার বাণিজ্যসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে ত্রিশাল পৌরসভার প্রধান সহকারী এছাহাক আলীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, এসব অনিয়মের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন এবং পৌরসভার বিভিন্ন সুবিধা ব্যক্তিগতভাবে ভোগ করছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ময়মনসিংহের ত্রিশাল পৌরসভার তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়েও এছাহাক আলী বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে পৌর প্রশাসকের আস্থাভাজন হিসেবে কাজ করার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম করে আসছেন।
অভিযোগ রয়েছে, গত ৫ আগস্টের পর পৌর মহিলা বিপণি কেন্দ্রের আটটি দোকানের প্রতিটি থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে আদায় করলেও পৌর কোষাগারে জমা দেওয়া হয় মাত্র ৩০০ টাকা করে। বাকি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এছাড়া পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ১০ থেকে ২০ শতাংশ কমিশন আদায়, নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য এবং বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের সঙ্গেও তিনি জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের চরপাড়া এলাকায় প্রায় তিন শতক জমির ওপর পাঁচতলা ভিতবিশিষ্ট একটি আলিশান ভবন নির্মাণ করেছেন এছাহাক আলী। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ৩২ লাখ টাকা দিয়ে জমি কিনে সেখানে কোটি টাকা ব্যয়ে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, ব্যক্তিগত সুবিধার্থে পৌরসভার অর্থায়নে তাঁর বাড়ি পর্যন্ত সিসি ঢালাই সড়ক নির্মাণ, ভবনের সামনে সোলার স্ট্রিট লাইট স্থাপন এবং প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয়ে পৃথক ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া তাঁর বাসায় একাধিক অবৈধ গ্যাস সংযোগ ব্যবহারের অভিযোগও স্থানীয়দের মধ্যে রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, পৌরসভার একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর পক্ষে কীভাবে এত সম্পদের মালিক হওয়া এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যক্তিগতভাবে ভোগ করা সম্ভব হলো।
পৌর প্রকৌশল দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয় রোড থেকে সালাম সাহেবের বাসা পর্যন্ত সিসি সড়ক নির্মাণে ১ লাখ ৬৮ হাজার ১৯৪ টাকা এবং ৩ নম্বর ওয়ার্ডে পৌর কর্মচারী এছাহাক আলীর বাসার সামনে আরসিসি স্ল্যাবসহ ড্রেন নির্মাণে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৬৬৯ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, এই দুটি প্রকল্পই মূলত তাঁর বাসাকেন্দ্রিক।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে নজরুল একাডেমির মাঠে ইটের সলিং নির্মাণে রাজস্ব খাত থেকে প্রায় আড়াই লাখ টাকা ব্যয় করা হলেও অনুষ্ঠান শেষে সেই ইট খুলে নিজের বাসায় নিয়ে যান এছাহাক আলী।
সূত্রগুলোর দাবি, পৌরসভার বিভিন্ন দপ্তরের কাজে তিনি ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন। একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়েও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও প্রকল্প বাস্তবায়নে তাঁর ভূমিকা নিয়ে পৌরসভার অভ্যন্তরে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, নির্বাচিত মেয়র না থাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের আস্থা অর্জন করে এছাহাক আলী পৌরসভার বিভিন্ন বিষয়ে প্রভাব খাটাচ্ছেন। কেউ তাঁর বিরোধিতা করলে প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়তে হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।
এছাহাক আলীর গ্রামের বাড়ি ত্রিশাল উপজেলার সাখুয়া ইউনিয়নের একটি প্রত্যন্ত এলাকায়। স্থানীয়দের দাবি, কৃষক পরিবারের সন্তান হিসেবে চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তাঁর আর্থিক অবস্থার অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে। বর্তমানে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পৌরসভার একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি তৎকালীন মেয়রদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সরকার পরিবর্তনের পরও নতুন প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখে পৌরসভার বিভিন্ন আর্থিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করছেন। গত দুই বছরে বিভিন্ন টেন্ডার কার্যক্রম, মার্কেটের ভাড়া আদায় এবং উন্নয়ন প্রকল্পে লাখ লাখ টাকার অনিয়মের সঙ্গে তিনি জড়িত বলে অভিযোগ করেন তারা।
অভিযোগ অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর পৌর মহিলা বিপণি কেন্দ্রের দোকানগুলোর ভাড়া আদায় করতেন প্রধান সহকারী এছহাক আলী দোকানপ্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে রিসিট বিহিন ভাড়া আদায় করলেও জমা দেননি। তবে পৌরসভার হিসাবে দোকানপ্রতি জমা হতো মাত্র ৩০০ টাকা করে।
পৌর মহিলা বিপণি কেন্দ্রের দোকানী আজিজুল বলেন, দোকানের সিকিউরিটি বাবদ এছাহাক আলী আমার কাছ থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন। কোন কাগজ পত্র দেন নাই। শুনেছি পৌরসভায় জমা হয়েছে ১ লাখ টাকা।
পৌরসভার সাবেক মহিলা কাউন্সিলর মোছা. নাছিমা পারভীন অভিযোগে বলেন, "এছাহাক আলী তাঁর ক্ষমতার অপব্যবহার করে পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ নিজের নামে বা আত্মীয়-স্বজনের নামে করিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এছাড়া পৌর মার্কেটের দোকান নির্মাণ, ড্রেন নির্মাণ, অফিসের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন কাজে তাঁর একক প্রভাব রয়েছে। ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন আদায় এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে নিজের ইচ্ছামতো কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।"
নাছিমা পারভীন আরও বলেন, "অফিসের ভেতরে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ায় অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পান না। তাঁর কারণে পৌরসভার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আমি তার বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে বিভাগীয় কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।"
পৌরসভার সাবেক ভারপ্রাপ্ত মেয়র আমিনুল ইসলাম খোকন অভিযোগ করে বলেন, "এছাহাক আলী পৌরসভার তৃতীয় শ্রেণির একজন কর্মচারী হলেও বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। নতুন কোনো প্রশাসক যোগ দিলেই তিনি বিভিন্ন প্রকল্প নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।"
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে কয়েকদিন ধরে প্রধান সহকারী এছাহাক আলীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। একদিন তিনি মুঠোফোনে বলেন, "আমি প্রশাসক স্যারের কক্ষে কাজে ব্যস্ত আছি, পরে ফোন দিচ্ছি।" এরপর একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ত্রিশাল পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা নওশিন আহমেদ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, "আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না। আমি অনেক অসুস্থ।" এছাড়া সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বিষয়ে তিনি পৌর প্রকৌশলী এবং সার্বিক বিষয়ে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
ত্রিশাল পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাবেরী জালাল বলেন, "আমি সাত-আট মাসের ছুটি শেষে সম্প্রতি অফিসে যোগদান করেছি। তাই এসব বিষয়ে আমার জানা নেই। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
এছাহাক আলীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে ত্রিশাল পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরাফাত সিদ্দিকীর বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে কল এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও সংবাদ প্রকাশ পর্যন্ত তিনি কোনো সাড়া দেননি।
