রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬
ONE NEWS EXPRESS

মরদেহ উদ্ধার

শীতলক্ষ্যায় উদ্ধার অভিযানের নদীতে পড়ে নিখোঁজ ডুবুরি সাদিক


মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ
মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ সহ-সম্পাদক
প্রকাশ : শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ১১:০২ পূর্বাহ্ণ | প্রিন্ট | ডাউনলোড কার্ড

শীতলক্ষ্যায় উদ্ধার অভিযানের নদীতে পড়ে নিখোঁজ ডুবুরি সাদিক

পানির নিচে নিখোঁজ মানুষের ঠিকানা খুঁজে বের করাই ছিল তাঁর পেশা ও দায়িত্ব। অসংখ্য ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযানের সাহসী নায়ক, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ফায়ার সার্ভিসের চৌকষ ডুবুরি সাদিক (২৬)। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, এবার আর ফিরে এলেন না তিনি। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর বুকে দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই প্রাণ হারালেন এই অকুতোভয় সেনানী। তাঁর ট্র্যাজিক মৃত্যুতে সহকর্মী, স্বজন এবং পুরো ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

​বৃহস্পতিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ শহরের নিতাইগঞ্জ ফায়ার ঘাট এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে জমে থাকা কচুরিপানা পরিষ্কারের কাজ চলছিল। নারায়ণগঞ্জ নদী ফায়ার স্টেশনের একটি তিন সদস্যের দল স্পিডবোটে করে এই কাজ পরিচালনা করছিল। সাহসী ডুবুরি সাদিক স্পিডবোটের সামনের অংশে অবস্থান নিয়ে কচুরিপানা অপসারণ করছিলেন। হঠাৎ নদীর শক্তিশালী ঢেউয়ের ধাক্কায় তিনি ভারসাম্য হারিয়ে পানিতে পড়ে যান এবং মুহূর্তেই পানির অতল গভীরে নিখোঁজ হয়ে যান। যে মানুষটি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বারবার অন্যের প্রাণ বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়তেন পানির গভীরে, এবার তাঁর নিজেরই প্রাণ কেড়ে নিল সেই নদী।

​খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী ডুবুরি দল অবিলম্বে দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে আসে এবং শুরু করে উদ্ধার অভিযান। প্রায় আট ঘণ্টার নিরন্তর প্রচেষ্টার পর, সন্ধ্যা ৭টার দিকে দুর্ঘটনাস্থল থেকে অদূরে কেরোসিন ঘাট এলাকা থেকে সাদিকের নিথর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে তাঁর মরদেহ নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। দুর্ঘটনার খবর শুনেই হাসপাতালে ছুটে আসেন তাঁর স্ত্রী সাদিয়া, পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা। মর্গের সামনে প্রিয় মানুষের নিথর দেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁরা। স্বজনদের আহাজারিতে হাসপাতাল চত্বরের আকাশ ভারী হয়ে ওঠে।

​নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, নদী ফায়ার স্টেশনের জেটির সামনে জমে থাকা কচুরিপানা অপসারণের কাজ করার সময় স্পিডবোটের সামনের দিকে থাকা সাদিক ঢেউয়ের ধাক্কায় নদীতে পড়ে যান। দুর্ঘটনার সময় স্পিডবোটে থাকা অন্য দুই সদস্যের ভাষ্যমতে, পড়ে যাওয়ার সময় তাঁর মাথায় আঘাত লেগে থাকতে পারে। কারণ, সাদিক একজন অত্যন্ত প্রশিক্ষিত ও দক্ষ ডুবুরি ছিলেন। কোনো গুরুতর আঘাত না পেলে এভাবে সহজেই তিনি নিখোঁজ হওয়ার কথা নয়।

​২০০১ সালের ১০ অক্টোবর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার কুমরাকান্দি গ্রামে জন্ম নেওয়া সাদিক ২০২১ সালের ২৪ অক্টোবর ফায়ার সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলেন। ২০২২ সালের ৮ অক্টোবর তিনি নারায়ণগঞ্জ নদী ফায়ার স্টেশনে পদায়ন পান। অল্প সময়েই নিজের সাহস, দক্ষতা এবং নিষ্ঠা দিয়ে সহকর্মীদের আস্থা ও শ্রদ্ধা অর্জন করেন তিনি। পানিতে ডুবে যাওয়া মানুষের মরদেহ উদ্ধার, নদীতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযানে তিনি সবসময় সামনের সারিতে নেতৃত্ব দিতেন। সম্প্রতি সিদ্ধিরগঞ্জের একটি লেকে নিখোঁজ তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের অভিযানে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ব্যাপক প্রশংসিত হয়। দায়িত্বশীলতা ও সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ গত বছর তিনি ‘সেরা ডুবুরি’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও পদক লাভ করেছিলেন।

​পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, চার ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন সাদিক এবং তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং স্ত্রীকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ শহরের ডালপট্টি এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন। তাঁর সংসারের স্বপ্নগুলো তখনও রঙিন ছিল। কিন্তু দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেশপ্রেমের চূড়ান্ত আত্মত্যাগ করে থেমে গেল তাঁর সেই স্বপ্নের পথচলা।

​ঘটনার খবর পেয়ে দুর্ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহিদ কামাল। তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং এই মর্মান্তিক ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় তদন্ত ও ব্যবস্থার নির্দেশ দেন। তাঁর এই অকাল মৃত্যুতে শুধু নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস নয়, পুরো জাতি একজন যোগ্য ও সাহসী উদ্ধারকর্মীকে হারাল। সাদিকের সাহসিকতা এবং আত্মত্যাগ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

এই সংবাদটি আপনার কেমন লেগেছে?


খবরটি রেটিং দিন

গড় রেটিং: /৫ ( ভোট)

ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

ONE NEWS EXPRESS

রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬


শীতলক্ষ্যায় উদ্ধার অভিযানের নদীতে পড়ে নিখোঁজ ডুবুরি সাদিক

প্রকাশের তারিখ : শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ১১:০২ পূর্বাহ্ণ

featured Image

পানির নিচে নিখোঁজ মানুষের ঠিকানা খুঁজে বের করাই ছিল তাঁর পেশা ও দায়িত্ব। অসংখ্য ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযানের সাহসী নায়ক, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ফায়ার সার্ভিসের চৌকষ ডুবুরি সাদিক (২৬)। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, এবার আর ফিরে এলেন না তিনি। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর বুকে দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই প্রাণ হারালেন এই অকুতোভয় সেনানী। তাঁর ট্র্যাজিক মৃত্যুতে সহকর্মী, স্বজন এবং পুরো ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

​বৃহস্পতিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ শহরের নিতাইগঞ্জ ফায়ার ঘাট এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে জমে থাকা কচুরিপানা পরিষ্কারের কাজ চলছিল। নারায়ণগঞ্জ নদী ফায়ার স্টেশনের একটি তিন সদস্যের দল স্পিডবোটে করে এই কাজ পরিচালনা করছিল। সাহসী ডুবুরি সাদিক স্পিডবোটের সামনের অংশে অবস্থান নিয়ে কচুরিপানা অপসারণ করছিলেন। হঠাৎ নদীর শক্তিশালী ঢেউয়ের ধাক্কায় তিনি ভারসাম্য হারিয়ে পানিতে পড়ে যান এবং মুহূর্তেই পানির অতল গভীরে নিখোঁজ হয়ে যান। যে মানুষটি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বারবার অন্যের প্রাণ বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়তেন পানির গভীরে, এবার তাঁর নিজেরই প্রাণ কেড়ে নিল সেই নদী।

​খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী ডুবুরি দল অবিলম্বে দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে আসে এবং শুরু করে উদ্ধার অভিযান। প্রায় আট ঘণ্টার নিরন্তর প্রচেষ্টার পর, সন্ধ্যা ৭টার দিকে দুর্ঘটনাস্থল থেকে অদূরে কেরোসিন ঘাট এলাকা থেকে সাদিকের নিথর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে তাঁর মরদেহ নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। দুর্ঘটনার খবর শুনেই হাসপাতালে ছুটে আসেন তাঁর স্ত্রী সাদিয়া, পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা। মর্গের সামনে প্রিয় মানুষের নিথর দেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁরা। স্বজনদের আহাজারিতে হাসপাতাল চত্বরের আকাশ ভারী হয়ে ওঠে।

​নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, নদী ফায়ার স্টেশনের জেটির সামনে জমে থাকা কচুরিপানা অপসারণের কাজ করার সময় স্পিডবোটের সামনের দিকে থাকা সাদিক ঢেউয়ের ধাক্কায় নদীতে পড়ে যান। দুর্ঘটনার সময় স্পিডবোটে থাকা অন্য দুই সদস্যের ভাষ্যমতে, পড়ে যাওয়ার সময় তাঁর মাথায় আঘাত লেগে থাকতে পারে। কারণ, সাদিক একজন অত্যন্ত প্রশিক্ষিত ও দক্ষ ডুবুরি ছিলেন। কোনো গুরুতর আঘাত না পেলে এভাবে সহজেই তিনি নিখোঁজ হওয়ার কথা নয়।

​২০০১ সালের ১০ অক্টোবর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার কুমরাকান্দি গ্রামে জন্ম নেওয়া সাদিক ২০২১ সালের ২৪ অক্টোবর ফায়ার সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলেন। ২০২২ সালের ৮ অক্টোবর তিনি নারায়ণগঞ্জ নদী ফায়ার স্টেশনে পদায়ন পান। অল্প সময়েই নিজের সাহস, দক্ষতা এবং নিষ্ঠা দিয়ে সহকর্মীদের আস্থা ও শ্রদ্ধা অর্জন করেন তিনি। পানিতে ডুবে যাওয়া মানুষের মরদেহ উদ্ধার, নদীতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযানে তিনি সবসময় সামনের সারিতে নেতৃত্ব দিতেন। সম্প্রতি সিদ্ধিরগঞ্জের একটি লেকে নিখোঁজ তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের অভিযানে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ব্যাপক প্রশংসিত হয়। দায়িত্বশীলতা ও সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ গত বছর তিনি ‘সেরা ডুবুরি’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও পদক লাভ করেছিলেন।

​পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, চার ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন সাদিক এবং তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং স্ত্রীকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ শহরের ডালপট্টি এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন। তাঁর সংসারের স্বপ্নগুলো তখনও রঙিন ছিল। কিন্তু দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেশপ্রেমের চূড়ান্ত আত্মত্যাগ করে থেমে গেল তাঁর সেই স্বপ্নের পথচলা।

​ঘটনার খবর পেয়ে দুর্ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহিদ কামাল। তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং এই মর্মান্তিক ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় তদন্ত ও ব্যবস্থার নির্দেশ দেন। তাঁর এই অকাল মৃত্যুতে শুধু নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস নয়, পুরো জাতি একজন যোগ্য ও সাহসী উদ্ধারকর্মীকে হারাল। সাদিকের সাহসিকতা এবং আত্মত্যাগ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।


ONE NEWS EXPRESS

সম্পাদক ও প্রকাশক- মো: মনিরুজ্জামান
সহ-সম্পাদক: তুহিন আহসান
বার্তা সম্পাদক: তামিমা জান্নাত

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
শীতলক্ষ্যায় উদ্ধার অভিযানের নদীতে পড়ে নিখোঁজ ডুবুরি সাদিক
0:00 / 0:00
1x