ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার বিষয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্য বাংলাদেশ ও ভারতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। পর্যবেক্ষকরা এটিকে একটি সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না দেখে ‘জল মাপা’ বা পরিস্থিতি মূল্যায়নের চেষ্টা হিসেবেই দেখছেন। এর পেছনে ভারত ও শেখ হাসিনার নিজস্ব কিছু কৌশলগত হিসাব-নিকাশ কাজ করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই ঘোষণায় ভারতের লাভ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। যদি শেখ হাসিনা সত্যিই দেশে ফেরেন, তাহলে ভারত গত দু'বছর ধরে চলা একটি কূটনৈতিক অস্বস্তি থেকে মুক্তি পাবে। আর যদি তিনি না-ও ফেরেন, তাহলেও ভারত বলতে পারবে যে শেখ হাসিনা ফিরতে চেয়েছিলেন, কিন্তু অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হওয়ায় ভারত তাকে রাখতে বাধ্য হয়েছে।
ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল ১৪ই জুলাই জানান, শেখ হাসিনার ভারতে থাকা নিয়ে তাদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ভারত বরাবরই বলে আসছে যে, একটি বিশেষ নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা আশ্রয় চাইলে তার সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই সেই আবেদনে সাড়া দেওয়া হয়েছিল।
তবে দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুরোধে ভারত কোনো জবাব না দিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছে। ফলে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার উপস্থিতি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চরম অস্বস্তির কারণ হয়ে আছে, যা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
বিশ্লেষক ও সাবেক কূটনীতিকরা একমত যে ভারতের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছাড়া শেখ হাসিনা এই কথা বলেননি। ঢাকায় ভারতের সাবেক হাই কমিশনার পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী মনে করেন, শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে বাঁচাতে সত্যিই ফিরতে উৎসুক এবং সিরিয়াস।
চক্রবর্তী আরও বলেন, শেখ হাসিনা ঢাকায় ফিরলেই তাকে সরাসরি ফাঁসিতে ঝোলানো ততটা সহজ নয়। তার ধারণা, তিনি মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করবেন এবং বিচার চলাকালীন ক্যান্টনমেন্টে নিরাপদে থাকবেন। এর জন্য পর্দার আড়ালে দিল্লি ঢাকার সঙ্গে দরকষাকষি করলে তিনি অবাক হবেন না।
শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরুন বা না ফিরুন, ভারতের কোনোটাতেই বিশেষ অসুবিধা নেই, বরং লাভ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তিনি ফিরলে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে, আর না ফিরলে ভারত বাংলাদেশকেই দায়ী করতে পারবে।
যদি বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনার নতুন করে বিচারের প্রতিশ্রুতি দেয়, তবে সেটিও ভারতের জন্য একটি অর্জন হিসেবে বিবেচিত হবে। দিল্লি মনে করে, শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তার যে বিচার হয়েছিল, তা ত্রুটিপূর্ণ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল।
দিল্লির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার সিদ্ধান্তে তারও নিজস্ব কিছু হিসাব-নিকাশ কাজ করেছে। গত দু'বছর ধরে নির্যাতিত আওয়ামী লীগ কর্মীদের কাছে বার্তা দিতে চেয়েছেন যে তিনি ফেরার ব্যাপারে সিরিয়াস এবং তাদের মনোবল চাঙ্গা করতে চান।
দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনা উপলব্ধি করেছেন যে আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে দলটিকে ফিরিয়ে আনতে হলে তাকে সশরীরেই বাংলাদেশে পা রাখতে হবে, যা ভারত থেকে সম্ভব নয়।
দিল্লির প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক জয়ন্ত রায়চেৌধুরীর মতে, শেখ হাসিনা বিএনপিকে এই বার্তা দিতে চান যে, আওয়ামী লীগকে অপ্রাসঙ্গিক করার চেষ্টা তিনি নিজে গিয়ে রুখবেন। তার এই পদক্ষেপে ভারতেরও প্রচ্ছন্ন সায় আছে।
নিজে থেকে দেশে ফেরার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে তিনি বাংলাদেশ সরকারকেও কিছুটা চাপে ফেলতে চান। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তার যে মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল, আওয়ামী লীগের মতে তা নিরপেক্ষ বিচার ছিল না। নতুন করে বিচার প্রক্রিয়া শুরুর জন্য চাপ সৃষ্টি করতে হলে তাকে আগে বাংলাদেশে ফিরতে হবে।
দেশে ফিরে আদালতের কাছে আত্মসমর্পণের কথা বলার মাধ্যমে শেখ হাসিনা এই বার্তাও দিতে চেয়েছেন যে, তিনি দেশের বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা রাখতে রাজি, তবে রাষ্ট্রকেও সুষ্ঠু ও অবাধ বিচারের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী, যারা ভারতে আশ্রয় নিয়ে আছেন, তারা মনে করেন বাংলাদেশ সরকার মুখে যাই বলুক, আসলে মোটেই চায় না শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসুন। তাদের ধারণা, শেখ হাসিনা ফিরলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল ও অস্থিতিশীল হতে পারে।
ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে, তারা শেখ হাসিনাকে নিজে থেকে ডেকে আনেনি বা জোর করে তাড়িয়েও দিচ্ছে না। তারা তাকে একজন ‘ফ্রি এজেন্ট’ হিসেবে দেখে, যিনি তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিজেই নেবেন।
গড় রেটিং: ০/৫ (০ ভোট)
ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৭:০৭ পূর্বাহ্ণ
ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার বিষয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্য বাংলাদেশ ও ভারতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। পর্যবেক্ষকরা এটিকে একটি সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না দেখে ‘জল মাপা’ বা পরিস্থিতি মূল্যায়নের চেষ্টা হিসেবেই দেখছেন। এর পেছনে ভারত ও শেখ হাসিনার নিজস্ব কিছু কৌশলগত হিসাব-নিকাশ কাজ করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই ঘোষণায় ভারতের লাভ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। যদি শেখ হাসিনা সত্যিই দেশে ফেরেন, তাহলে ভারত গত দু'বছর ধরে চলা একটি কূটনৈতিক অস্বস্তি থেকে মুক্তি পাবে। আর যদি তিনি না-ও ফেরেন, তাহলেও ভারত বলতে পারবে যে শেখ হাসিনা ফিরতে চেয়েছিলেন, কিন্তু অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হওয়ায় ভারত তাকে রাখতে বাধ্য হয়েছে।
ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল ১৪ই জুলাই জানান, শেখ হাসিনার ভারতে থাকা নিয়ে তাদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ভারত বরাবরই বলে আসছে যে, একটি বিশেষ নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা আশ্রয় চাইলে তার সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই সেই আবেদনে সাড়া দেওয়া হয়েছিল।
তবে দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুরোধে ভারত কোনো জবাব না দিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছে। ফলে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার উপস্থিতি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চরম অস্বস্তির কারণ হয়ে আছে, যা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
বিশ্লেষক ও সাবেক কূটনীতিকরা একমত যে ভারতের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছাড়া শেখ হাসিনা এই কথা বলেননি। ঢাকায় ভারতের সাবেক হাই কমিশনার পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী মনে করেন, শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে বাঁচাতে সত্যিই ফিরতে উৎসুক এবং সিরিয়াস।
চক্রবর্তী আরও বলেন, শেখ হাসিনা ঢাকায় ফিরলেই তাকে সরাসরি ফাঁসিতে ঝোলানো ততটা সহজ নয়। তার ধারণা, তিনি মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করবেন এবং বিচার চলাকালীন ক্যান্টনমেন্টে নিরাপদে থাকবেন। এর জন্য পর্দার আড়ালে দিল্লি ঢাকার সঙ্গে দরকষাকষি করলে তিনি অবাক হবেন না।
শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরুন বা না ফিরুন, ভারতের কোনোটাতেই বিশেষ অসুবিধা নেই, বরং লাভ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তিনি ফিরলে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে, আর না ফিরলে ভারত বাংলাদেশকেই দায়ী করতে পারবে।
যদি বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনার নতুন করে বিচারের প্রতিশ্রুতি দেয়, তবে সেটিও ভারতের জন্য একটি অর্জন হিসেবে বিবেচিত হবে। দিল্লি মনে করে, শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তার যে বিচার হয়েছিল, তা ত্রুটিপূর্ণ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল।
দিল্লির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার সিদ্ধান্তে তারও নিজস্ব কিছু হিসাব-নিকাশ কাজ করেছে। গত দু'বছর ধরে নির্যাতিত আওয়ামী লীগ কর্মীদের কাছে বার্তা দিতে চেয়েছেন যে তিনি ফেরার ব্যাপারে সিরিয়াস এবং তাদের মনোবল চাঙ্গা করতে চান।
দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনা উপলব্ধি করেছেন যে আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে দলটিকে ফিরিয়ে আনতে হলে তাকে সশরীরেই বাংলাদেশে পা রাখতে হবে, যা ভারত থেকে সম্ভব নয়।
দিল্লির প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক জয়ন্ত রায়চেৌধুরীর মতে, শেখ হাসিনা বিএনপিকে এই বার্তা দিতে চান যে, আওয়ামী লীগকে অপ্রাসঙ্গিক করার চেষ্টা তিনি নিজে গিয়ে রুখবেন। তার এই পদক্ষেপে ভারতেরও প্রচ্ছন্ন সায় আছে।
নিজে থেকে দেশে ফেরার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে তিনি বাংলাদেশ সরকারকেও কিছুটা চাপে ফেলতে চান। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তার যে মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল, আওয়ামী লীগের মতে তা নিরপেক্ষ বিচার ছিল না। নতুন করে বিচার প্রক্রিয়া শুরুর জন্য চাপ সৃষ্টি করতে হলে তাকে আগে বাংলাদেশে ফিরতে হবে।
দেশে ফিরে আদালতের কাছে আত্মসমর্পণের কথা বলার মাধ্যমে শেখ হাসিনা এই বার্তাও দিতে চেয়েছেন যে, তিনি দেশের বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা রাখতে রাজি, তবে রাষ্ট্রকেও সুষ্ঠু ও অবাধ বিচারের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী, যারা ভারতে আশ্রয় নিয়ে আছেন, তারা মনে করেন বাংলাদেশ সরকার মুখে যাই বলুক, আসলে মোটেই চায় না শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসুন। তাদের ধারণা, শেখ হাসিনা ফিরলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল ও অস্থিতিশীল হতে পারে।
ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে, তারা শেখ হাসিনাকে নিজে থেকে ডেকে আনেনি বা জোর করে তাড়িয়েও দিচ্ছে না। তারা তাকে একজন ‘ফ্রি এজেন্ট’ হিসেবে দেখে, যিনি তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিজেই নেবেন।
