যুক্তরাজ্যের লন্ডনে ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডনের (টিএফএল) ডিজিটাল অবকাঠামোতে নজিরবিহীন সাইবার হামলায় লাখো মানুষের যাতায়াত কয়েক দিনের জন্য অচল হয়ে পড়েছিল। এতে প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ পাউন্ডের ক্ষতি হয়েছিল। প্রায় দুই বছর পর সেই হামলার দায়ে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তালহা জুবায়ের (২০) ও তাঁর ব্রিটিশ সহযোগী ওয়েন ফ্লাওয়ার্সকে (১৮) সাড়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন উলউইচ ক্রাউন কোর্ট। গতকাল বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) আদালত এ রায় দেন।
বিচারক মার্ক টার্নার রায়ে বলেন, এটি রাষ্ট্র-সমর্থিত কোনো অন্তর্ঘাত ছিল না, বরং আন্তর্জাতিক হ্যাকার গোষ্ঠী ‘স্ক্যাটার্ড স্পাইডার’ নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণের উদ্দেশ্যে এ হামলা চালিয়েছিল। আসামিরা লাখো মানুষের দুর্ভোগের কথা উপেক্ষা করেই বেপরোয়া বাহাদুরি দেখিয়েছিলেন। কম্পিউটার মিসইউজ আইনের ৩ জেডএ ধারায় গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোয় হামলার সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন হলেও, আসামিদের বয়স, নিউরোডাইভারজেন্ট অবস্থা এবং দোষ স্বীকার করায় সাজার ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা কয়েক দিন হ্যাকার চক্র টিএফএলের নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ করে। একপর্যায়ে তারা পুরো সিস্টেমের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় টিএফএল পুরো নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করতে বাধ্য হয়, যার ফলে প্রায় ২৮ হাজার কর্মীকে নতুন করে পাসওয়ার্ড ও নিরাপত্তা পরিচয়পত্র ‘রিসেট’ করতে হয়েছিল।
তদন্তে জানা যায়, হামলার সময় ওয়েন ফ্লাওয়ার্স পুরো হ্যাকিং কার্যক্রমের ভিডিও ধারণ করেন এবং জুবায়ের তা বন্ধুদের একটি টেলিগ্রাম গ্রুপে ছড়িয়ে দিয়ে লন্ডনের পরিবহন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা নিয়ে দম্ভোক্তি করেন। পূর্ব লন্ডনের বো এলাকার এক ফ্ল্যাটে মা-বাবার সঙ্গে থাকতেন জুবায়ের, যার বিরুদ্ধে কিশোর বয়স থেকেই অনলাইন প্রতারণাসহ কম্পিউটার-সংশ্লিষ্ট অপরাধের একাধিক রেকর্ড ছিল। অন্যদিকে ফ্লাওয়ার্স ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসে নানি ও মামার সঙ্গে থাকতেন এবং তিনি পুলিশের নজরদারিতে ছিলেন।
তদন্তকারীরা জানান, বড় বড় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে ফেললে শেষ পর্যন্ত একটি সাধারণ ডিজিটাল সূত্রই হ্যাকারদের ধরিয়ে দেয়। জুবায়েরের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেট ব্যবহার করে গিফট কার্ড ও একটি অনলাইন গেমিং অ্যাকাউন্টে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছিল। এসব লেনদেনসহ বিভিন্ন ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা তাঁর অনলাইন পরিচয়, সার্ভার অবকাঠামো এবং পূর্ব লন্ডনের বাসার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হন।
যুক্তরাজ্যে সাজা ঘোষণার মধ্য দিয়ে এ মামলার একটি অধ্যায় শেষ হলেও, জুবায়েরের সামনে যুক্তরাষ্ট্রে আরও বড় আইনি লড়াই অপেক্ষা করছে। মার্কিন বিচার বিভাগ তাঁর বিরুদ্ধে পৃথক ফৌজদারি অভিযোগ এনেছে, যেখানে বলা হয়েছে যে তাঁর চক্র ৪৭টি প্রতিষ্ঠানে ১২০টির বেশি সাইবার হামলা চালিয়ে ১১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ আদায় করেছে। যুক্তরাজ্যে কারাদণ্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর জুবায়েরের যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণের বিষয়টি সামনে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই মামলাটি আধুনিক রাষ্ট্রের ডিজিটাল নিরাপত্তার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। টিএফএলের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে সাইবার হামলা প্রমাণ করেছে যে, দক্ষ হ্যাকাররা দূরে বসেই একটি শহরের জনজীবনকে অচল করে দিতে পারে। একই সঙ্গে এটি দেখিয়েছে যে, ডিজিটাল জগতে অপরাধ যতই জটিল হোক, শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তিই অপরাধীদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হতে পারে।
গড় রেটিং: ০/৫ (০ ভোট)
ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৩ অপরাহ্ণ
যুক্তরাজ্যের লন্ডনে ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডনের (টিএফএল) ডিজিটাল অবকাঠামোতে নজিরবিহীন সাইবার হামলায় লাখো মানুষের যাতায়াত কয়েক দিনের জন্য অচল হয়ে পড়েছিল। এতে প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ পাউন্ডের ক্ষতি হয়েছিল। প্রায় দুই বছর পর সেই হামলার দায়ে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তালহা জুবায়ের (২০) ও তাঁর ব্রিটিশ সহযোগী ওয়েন ফ্লাওয়ার্সকে (১৮) সাড়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন উলউইচ ক্রাউন কোর্ট। গতকাল বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) আদালত এ রায় দেন।
বিচারক মার্ক টার্নার রায়ে বলেন, এটি রাষ্ট্র-সমর্থিত কোনো অন্তর্ঘাত ছিল না, বরং আন্তর্জাতিক হ্যাকার গোষ্ঠী ‘স্ক্যাটার্ড স্পাইডার’ নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণের উদ্দেশ্যে এ হামলা চালিয়েছিল। আসামিরা লাখো মানুষের দুর্ভোগের কথা উপেক্ষা করেই বেপরোয়া বাহাদুরি দেখিয়েছিলেন। কম্পিউটার মিসইউজ আইনের ৩ জেডএ ধারায় গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোয় হামলার সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন হলেও, আসামিদের বয়স, নিউরোডাইভারজেন্ট অবস্থা এবং দোষ স্বীকার করায় সাজার ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা কয়েক দিন হ্যাকার চক্র টিএফএলের নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ করে। একপর্যায়ে তারা পুরো সিস্টেমের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় টিএফএল পুরো নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করতে বাধ্য হয়, যার ফলে প্রায় ২৮ হাজার কর্মীকে নতুন করে পাসওয়ার্ড ও নিরাপত্তা পরিচয়পত্র ‘রিসেট’ করতে হয়েছিল।
তদন্তে জানা যায়, হামলার সময় ওয়েন ফ্লাওয়ার্স পুরো হ্যাকিং কার্যক্রমের ভিডিও ধারণ করেন এবং জুবায়ের তা বন্ধুদের একটি টেলিগ্রাম গ্রুপে ছড়িয়ে দিয়ে লন্ডনের পরিবহন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা নিয়ে দম্ভোক্তি করেন। পূর্ব লন্ডনের বো এলাকার এক ফ্ল্যাটে মা-বাবার সঙ্গে থাকতেন জুবায়ের, যার বিরুদ্ধে কিশোর বয়স থেকেই অনলাইন প্রতারণাসহ কম্পিউটার-সংশ্লিষ্ট অপরাধের একাধিক রেকর্ড ছিল। অন্যদিকে ফ্লাওয়ার্স ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসে নানি ও মামার সঙ্গে থাকতেন এবং তিনি পুলিশের নজরদারিতে ছিলেন।
তদন্তকারীরা জানান, বড় বড় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে ফেললে শেষ পর্যন্ত একটি সাধারণ ডিজিটাল সূত্রই হ্যাকারদের ধরিয়ে দেয়। জুবায়েরের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেট ব্যবহার করে গিফট কার্ড ও একটি অনলাইন গেমিং অ্যাকাউন্টে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছিল। এসব লেনদেনসহ বিভিন্ন ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা তাঁর অনলাইন পরিচয়, সার্ভার অবকাঠামো এবং পূর্ব লন্ডনের বাসার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হন।
যুক্তরাজ্যে সাজা ঘোষণার মধ্য দিয়ে এ মামলার একটি অধ্যায় শেষ হলেও, জুবায়েরের সামনে যুক্তরাষ্ট্রে আরও বড় আইনি লড়াই অপেক্ষা করছে। মার্কিন বিচার বিভাগ তাঁর বিরুদ্ধে পৃথক ফৌজদারি অভিযোগ এনেছে, যেখানে বলা হয়েছে যে তাঁর চক্র ৪৭টি প্রতিষ্ঠানে ১২০টির বেশি সাইবার হামলা চালিয়ে ১১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ আদায় করেছে। যুক্তরাজ্যে কারাদণ্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর জুবায়েরের যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণের বিষয়টি সামনে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই মামলাটি আধুনিক রাষ্ট্রের ডিজিটাল নিরাপত্তার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। টিএফএলের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে সাইবার হামলা প্রমাণ করেছে যে, দক্ষ হ্যাকাররা দূরে বসেই একটি শহরের জনজীবনকে অচল করে দিতে পারে। একই সঙ্গে এটি দেখিয়েছে যে, ডিজিটাল জগতে অপরাধ যতই জটিল হোক, শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তিই অপরাধীদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হতে পারে।
