রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬
ONE NEWS EXPRESS

সম্পাদকীয়

বন্যা মোকাবিলায় চাই স্থায়ী সমাধান


প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ০১:৪৪ পূর্বাহ্ণ | প্রিন্ট | ডাউনলোড কার্ড

বন্যা মোকাবিলায় চাই স্থায়ী সমাধান

বাংলাদেশের মানুষ বন্যার সঙ্গে পরিচিত।

 শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ দেশের নদী, পলি ও বন্যা মিলে গড়ে তুলেছে বিশ্বের অন্যতম উর্বর একটি বদ্বীপ। 

একসময় মৌসুমি বন্যা ছিল প্রকৃতির আশীর্বাদ—জমিতে উর্বর পলি জমত, মৎস্যসম্পদ সমৃদ্ধ হতো, নদীর প্রাণ ফিরত। 

কিন্তু আজকের বাস্তবতা ভিন্ন। এখন বন্যা অনেক ক্ষেত্রেই আশীর্বাদ নয়, বরং মানুষের জীবন, অর্থনীতি, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামোর জন্য এক ভয়াবহ দুর্যোগে পরিণত হয়েছে।

প্রতিবছর বর্ষা এলেই দেশের কোনো না কোনো অঞ্চল প্লাবিত হয়। কখনও উত্তরাঞ্চলে, কখনও হাওরাঞ্চলে, কখনওবা পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি ঢলে, আবার কখনও মধ্যাঞ্চলের নদীবিধৌত জনপদে। 

হাজার হাজার পরিবার গৃহহীন হয়, লক্ষ লক্ষ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে, ফসল নষ্ট হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয় এবং পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ে। 

এরপর শুরু হয় ত্রাণ বিতরণ, উদ্ধার কার্যক্রম, রাজনৈতিক সফর এবং সহানুভূতির বার্তা। পানি নেমে গেলে সংবাদ শিরোনাম বদলে যায়। কিন্তু মানুষের দুর্ভোগ শেষ হয় না। পরের বছর আবার একই চিত্র।

এই পুনরাবৃত্তিই প্রমাণ করে—আমরা এখনও বন্যার কারণের চেয়ে পরিণতি নিয়েই বেশি ব্যস্ত।

বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী ব্যবস্থা মিলিয়ে যে বিশাল অববাহিকা তৈরি হয়েছে, তার নিম্নাংশে আমাদের অবস্থান। দেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত অধিকাংশ নদীর উৎস দেশের বাইরে। ফলে ভারত, নেপাল, ভুটান কিংবা চীনের উজানে অতিবৃষ্টি হলে তার প্রভাব দ্রুত বাংলাদেশের নদীগুলোতে এসে পড়ে। এটি এমন একটি বাস্তবতা, যা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থানই সব নয়।

আজ জলবায়ু পরিবর্তন বন্যার চরিত্র বদলে দিয়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে যে দক্ষিণ এশিয়ায় চরম বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়ছে। অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, হিমালয়ের হিমবাহ গলার হার বৃদ্ধি এবং আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশ্বের জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে বায়ুমণ্ডলে জলীয়বাষ্প ধারণক্ষমতা বাড়ে, যার ফলে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোর বন্যা সেই সতর্কবার্তারই বাস্তব প্রতিফলন।

তবে প্রকৃতির ওপর সব দোষ চাপিয়ে দিলে নিজেদের দায় এড়ানো হবে।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে অসংখ্য নদী দখল, দূষণ ও ভরাটের শিকার হয়েছে। অনেক নদী আজ নাব্যতা হারিয়েছে। নিয়মিত খননের অভাবে পলি জমে নদীর তলদেশ উঁচু হয়েছে। শত শত খাল ও জলাধার হারিয়ে গেছে। শহর ও গ্রামে জলাভূমি ভরাট করে আবাসন, মার্কেট, শিল্পকারখানা ও অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। এতে বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি ধারণের স্বাভাবিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে।

ফলে আজ অনেক এলাকায় বন্যার পাশাপাশি জলাবদ্ধতাও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি নদীকে শুধু নদী হিসেবে নয়, পুরো অববাহিকাকে একটি জীবন্ত ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে। নদী, শাখানদী, খাল, বিল, জলাভূমি এবং বন্যাপ্রবাহের প্রাকৃতিক পথ—সবকিছু মিলিয়েই একটি সুস্থ নদী ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এর যেকোনো একটি অংশ নষ্ট হলে পুরো ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিশ্বের কাছে একটি সফল উদাহরণ তৈরি করেছে। ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানি কমাতে আশ্রয়কেন্দ্র, আগাম সতর্কবার্তা এবং স্বেচ্ছাসেবক ব্যবস্থার যে উন্নতি হয়েছে, তা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। কিন্তু বন্যা ব্যবস্থাপনায় এখনও আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি।

আমরা এখনও বন্যা এলেই ত্রাণের কথা ভাবি; বন্যা না থাকলে নদীর কথা ভুলে যাই।

ত্রাণ মানবিক দায়িত্ব। ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও আশ্রয় পৌঁছে দেওয়া অবশ্যই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের সাফল্য কেবল ত্রাণ বিতরণে নয়; বরং এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলায়, যাতে প্রতিবছর একই মানুষকে একই দুর্ভোগে পড়তে না হয়।

বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ গ্রহণ করেছে। এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো পানি, নদী, জলবায়ু পরিবর্তন এবং টেকসই উন্নয়নকে সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করা। এটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ অনেক বেশি দুর্যোগ-সহনশীল হতে পারে। কিন্তু শুধু পরিকল্পনা গ্রহণ করলেই হবে না; তার বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী অভিন্ন নদীগুলোর পানি ব্যবস্থাপনায় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আরও কার্যকর সহযোগিতা জরুরি। আগাম তথ্য বিনিময়, যৌথ গবেষণা, নদী অববাহিকাভিত্তিক পরিকল্পনা এবং পানিপ্রবাহ ব্যবস্থাপনায় আঞ্চলিক সহযোগিতা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কঠিন।

দেশের প্রতিটি নদী, খাল ও জলাভূমির ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করতে হবে। অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইন প্রয়োগ করতে হবে। নদী খননকে প্রকল্পনির্ভর নয়, ধারাবাহিক জাতীয় কর্মসূচিতে পরিণত করতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

কৃষি খাতেও পরিবর্তন আনতে হবে। বন্যা-সহনশীল ধানের জাত, ভাসমান কৃষি, জলাবদ্ধতা সহনশীল প্রযুক্তি এবং কৃষি বীমা সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকদের ক্ষতি কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের জন্য স্থায়ী নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আরও ক্ষমতায়ন করতে হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক, পর্যাপ্ত উদ্ধার সরঞ্জাম, নৌযান, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানির সংরক্ষণ এবং নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা থাকতে হবে।

গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেবল দুর্গত মানুষের কান্না দেখিয়ে দায়িত্ব শেষ হয় না। কেন প্রতিবছর একই এলাকা প্লাবিত হয়, কোন নদী দখল হয়েছে, কোথায় খাল ভরাট হয়েছে, কোন প্রকল্পে অনিয়ম হয়েছে এবং কোন সমাধান কার্যকর হতে পারে—এসব বিষয়েও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা জরুরি। জনমত সৃষ্টি ছাড়া বড় নীতিগত পরিবর্তন সম্ভব নয়।

আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি জাতীয় নদী ও পানি কমিশন, যেখানে প্রকৌশলী, নদীবিজ্ঞানী, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, কৃষিবিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধিরা একসঙ্গে কাজ করবেন। নদীকে কেবল পানি উন্নয়নের বিষয় হিসেবে নয়, জাতীয় নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং অর্থনীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

  • বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে ৭০০টিরও বেশি নদী রয়েছে।
  • দেশের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি নদীর পানি দেশের বাইরে থেকে আসে।
  • স্বাভাবিক বছরে দেশের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ থেকে এক-চতুর্থাংশ এলাকা বন্যাকবলিত হয়; বড় বন্যায় তা অর্ধেকেরও বেশি এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
  • জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে আকস্মিক বন্যা ও অতিবৃষ্টির ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে।

One News Express-এর দৃষ্টিতে করণীয়

১. নদী, খাল ও জলাভূমি দখলমুক্ত করে নিয়মিত খনন নিশ্চিত করা। 

২. বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। 

৩. অভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনায় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা। 

৪. নদী ও জলাভূমি রক্ষায় বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা। 

৫. বিজ্ঞানভিত্তিক বন্যা পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আধুনিক করা। 

৬. দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। 

৭. বন্যা-সহনশীল কৃষি ও কৃষি বীমা সম্প্রসারণ করা। 

৮. স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিকে আরও কার্যকর করা। 

৯. নদী ও পরিবেশবিষয়ক গবেষণায় বাজেট বৃদ্ধি করা। 

১০. ত্রাণনির্ভরতা কমিয়ে পুনর্বাসন ও দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজনকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়া।

উপসংহার

বন্যা বাংলাদেশের নিয়তি হতে পারে, কিন্তু বন্যায় অসহায়ত্ব আমাদের নিয়তি হতে পারে না। একটি দূরদর্শী রাষ্ট্র কখনো শুধু দুর্যোগের পর সাহায্য দেয় না; বরং দুর্যোগের আগেই ক্ষয়ক্ষতি কমানোর ব্যবস্থা গড়ে তোলে। আজ সময় এসেছে ত্রাণের রাজনীতি থেকে পরিকল্পনার রাজনীতিতে ফিরে যাওয়ার।

প্রতি বছরের বন্যা আমাদের একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়—নদীকে জয় করা যায় না, নদীর সঙ্গে সহাবস্থান করতে হয়। সেই সহাবস্থান হতে হবে বিজ্ঞানভিত্তিক, পরিবেশবান্ধব এবং ভবিষ্যৎমুখী। তাহলেই আমরা বলতে পারব—বাংলাদেশে বন্যা আছে, কিন্তু বন্যা আর জাতীয় উন্নয়নের প্রধান বাধা নয়।

এই সংবাদটি আপনার কেমন লেগেছে?


খবরটি রেটিং দিন

গড় রেটিং: /৫ ( ভোট)

ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

ONE NEWS EXPRESS

রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬


বন্যা মোকাবিলায় চাই স্থায়ী সমাধান

প্রকাশের তারিখ : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ০১:৪৪ পূর্বাহ্ণ

featured Image

বাংলাদেশের মানুষ বন্যার সঙ্গে পরিচিত।

 শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ দেশের নদী, পলি ও বন্যা মিলে গড়ে তুলেছে বিশ্বের অন্যতম উর্বর একটি বদ্বীপ। 

একসময় মৌসুমি বন্যা ছিল প্রকৃতির আশীর্বাদ—জমিতে উর্বর পলি জমত, মৎস্যসম্পদ সমৃদ্ধ হতো, নদীর প্রাণ ফিরত। 

কিন্তু আজকের বাস্তবতা ভিন্ন। এখন বন্যা অনেক ক্ষেত্রেই আশীর্বাদ নয়, বরং মানুষের জীবন, অর্থনীতি, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামোর জন্য এক ভয়াবহ দুর্যোগে পরিণত হয়েছে।

প্রতিবছর বর্ষা এলেই দেশের কোনো না কোনো অঞ্চল প্লাবিত হয়। কখনও উত্তরাঞ্চলে, কখনও হাওরাঞ্চলে, কখনওবা পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি ঢলে, আবার কখনও মধ্যাঞ্চলের নদীবিধৌত জনপদে। 

হাজার হাজার পরিবার গৃহহীন হয়, লক্ষ লক্ষ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে, ফসল নষ্ট হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয় এবং পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ে। 

এরপর শুরু হয় ত্রাণ বিতরণ, উদ্ধার কার্যক্রম, রাজনৈতিক সফর এবং সহানুভূতির বার্তা। পানি নেমে গেলে সংবাদ শিরোনাম বদলে যায়। কিন্তু মানুষের দুর্ভোগ শেষ হয় না। পরের বছর আবার একই চিত্র।

এই পুনরাবৃত্তিই প্রমাণ করে—আমরা এখনও বন্যার কারণের চেয়ে পরিণতি নিয়েই বেশি ব্যস্ত।

বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী ব্যবস্থা মিলিয়ে যে বিশাল অববাহিকা তৈরি হয়েছে, তার নিম্নাংশে আমাদের অবস্থান। দেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত অধিকাংশ নদীর উৎস দেশের বাইরে। ফলে ভারত, নেপাল, ভুটান কিংবা চীনের উজানে অতিবৃষ্টি হলে তার প্রভাব দ্রুত বাংলাদেশের নদীগুলোতে এসে পড়ে। এটি এমন একটি বাস্তবতা, যা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থানই সব নয়।

আজ জলবায়ু পরিবর্তন বন্যার চরিত্র বদলে দিয়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে যে দক্ষিণ এশিয়ায় চরম বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়ছে। অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, হিমালয়ের হিমবাহ গলার হার বৃদ্ধি এবং আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশ্বের জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে বায়ুমণ্ডলে জলীয়বাষ্প ধারণক্ষমতা বাড়ে, যার ফলে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোর বন্যা সেই সতর্কবার্তারই বাস্তব প্রতিফলন।

তবে প্রকৃতির ওপর সব দোষ চাপিয়ে দিলে নিজেদের দায় এড়ানো হবে।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে অসংখ্য নদী দখল, দূষণ ও ভরাটের শিকার হয়েছে। অনেক নদী আজ নাব্যতা হারিয়েছে। নিয়মিত খননের অভাবে পলি জমে নদীর তলদেশ উঁচু হয়েছে। শত শত খাল ও জলাধার হারিয়ে গেছে। শহর ও গ্রামে জলাভূমি ভরাট করে আবাসন, মার্কেট, শিল্পকারখানা ও অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। এতে বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি ধারণের স্বাভাবিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে।

ফলে আজ অনেক এলাকায় বন্যার পাশাপাশি জলাবদ্ধতাও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি নদীকে শুধু নদী হিসেবে নয়, পুরো অববাহিকাকে একটি জীবন্ত ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে। নদী, শাখানদী, খাল, বিল, জলাভূমি এবং বন্যাপ্রবাহের প্রাকৃতিক পথ—সবকিছু মিলিয়েই একটি সুস্থ নদী ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এর যেকোনো একটি অংশ নষ্ট হলে পুরো ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিশ্বের কাছে একটি সফল উদাহরণ তৈরি করেছে। ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানি কমাতে আশ্রয়কেন্দ্র, আগাম সতর্কবার্তা এবং স্বেচ্ছাসেবক ব্যবস্থার যে উন্নতি হয়েছে, তা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। কিন্তু বন্যা ব্যবস্থাপনায় এখনও আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি।

আমরা এখনও বন্যা এলেই ত্রাণের কথা ভাবি; বন্যা না থাকলে নদীর কথা ভুলে যাই।

ত্রাণ মানবিক দায়িত্ব। ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও আশ্রয় পৌঁছে দেওয়া অবশ্যই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের সাফল্য কেবল ত্রাণ বিতরণে নয়; বরং এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলায়, যাতে প্রতিবছর একই মানুষকে একই দুর্ভোগে পড়তে না হয়।

বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ গ্রহণ করেছে। এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো পানি, নদী, জলবায়ু পরিবর্তন এবং টেকসই উন্নয়নকে সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করা। এটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ অনেক বেশি দুর্যোগ-সহনশীল হতে পারে। কিন্তু শুধু পরিকল্পনা গ্রহণ করলেই হবে না; তার বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী অভিন্ন নদীগুলোর পানি ব্যবস্থাপনায় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আরও কার্যকর সহযোগিতা জরুরি। আগাম তথ্য বিনিময়, যৌথ গবেষণা, নদী অববাহিকাভিত্তিক পরিকল্পনা এবং পানিপ্রবাহ ব্যবস্থাপনায় আঞ্চলিক সহযোগিতা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কঠিন।

দেশের প্রতিটি নদী, খাল ও জলাভূমির ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করতে হবে। অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইন প্রয়োগ করতে হবে। নদী খননকে প্রকল্পনির্ভর নয়, ধারাবাহিক জাতীয় কর্মসূচিতে পরিণত করতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

কৃষি খাতেও পরিবর্তন আনতে হবে। বন্যা-সহনশীল ধানের জাত, ভাসমান কৃষি, জলাবদ্ধতা সহনশীল প্রযুক্তি এবং কৃষি বীমা সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকদের ক্ষতি কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের জন্য স্থায়ী নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আরও ক্ষমতায়ন করতে হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক, পর্যাপ্ত উদ্ধার সরঞ্জাম, নৌযান, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানির সংরক্ষণ এবং নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা থাকতে হবে।

গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেবল দুর্গত মানুষের কান্না দেখিয়ে দায়িত্ব শেষ হয় না। কেন প্রতিবছর একই এলাকা প্লাবিত হয়, কোন নদী দখল হয়েছে, কোথায় খাল ভরাট হয়েছে, কোন প্রকল্পে অনিয়ম হয়েছে এবং কোন সমাধান কার্যকর হতে পারে—এসব বিষয়েও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা জরুরি। জনমত সৃষ্টি ছাড়া বড় নীতিগত পরিবর্তন সম্ভব নয়।

আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি জাতীয় নদী ও পানি কমিশন, যেখানে প্রকৌশলী, নদীবিজ্ঞানী, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, কৃষিবিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধিরা একসঙ্গে কাজ করবেন। নদীকে কেবল পানি উন্নয়নের বিষয় হিসেবে নয়, জাতীয় নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং অর্থনীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

  • বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে ৭০০টিরও বেশি নদী রয়েছে।
  • দেশের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি নদীর পানি দেশের বাইরে থেকে আসে।
  • স্বাভাবিক বছরে দেশের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ থেকে এক-চতুর্থাংশ এলাকা বন্যাকবলিত হয়; বড় বন্যায় তা অর্ধেকেরও বেশি এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
  • জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে আকস্মিক বন্যা ও অতিবৃষ্টির ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে।

One News Express-এর দৃষ্টিতে করণীয়

১. নদী, খাল ও জলাভূমি দখলমুক্ত করে নিয়মিত খনন নিশ্চিত করা। 

২. বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। 

৩. অভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনায় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা। 

৪. নদী ও জলাভূমি রক্ষায় বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা। 

৫. বিজ্ঞানভিত্তিক বন্যা পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আধুনিক করা। 

৬. দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। 

৭. বন্যা-সহনশীল কৃষি ও কৃষি বীমা সম্প্রসারণ করা। 

৮. স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিকে আরও কার্যকর করা। 

৯. নদী ও পরিবেশবিষয়ক গবেষণায় বাজেট বৃদ্ধি করা। 

১০. ত্রাণনির্ভরতা কমিয়ে পুনর্বাসন ও দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজনকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়া।

উপসংহার

বন্যা বাংলাদেশের নিয়তি হতে পারে, কিন্তু বন্যায় অসহায়ত্ব আমাদের নিয়তি হতে পারে না। একটি দূরদর্শী রাষ্ট্র কখনো শুধু দুর্যোগের পর সাহায্য দেয় না; বরং দুর্যোগের আগেই ক্ষয়ক্ষতি কমানোর ব্যবস্থা গড়ে তোলে। আজ সময় এসেছে ত্রাণের রাজনীতি থেকে পরিকল্পনার রাজনীতিতে ফিরে যাওয়ার।

প্রতি বছরের বন্যা আমাদের একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়—নদীকে জয় করা যায় না, নদীর সঙ্গে সহাবস্থান করতে হয়। সেই সহাবস্থান হতে হবে বিজ্ঞানভিত্তিক, পরিবেশবান্ধব এবং ভবিষ্যৎমুখী। তাহলেই আমরা বলতে পারব—বাংলাদেশে বন্যা আছে, কিন্তু বন্যা আর জাতীয় উন্নয়নের প্রধান বাধা নয়।


ONE NEWS EXPRESS

সম্পাদক ও প্রকাশক- মো: মনিরুজ্জামান
সহ-সম্পাদক: তুহিন আহসান
বার্তা সম্পাদক: তামিমা জান্নাত

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
বন্যা মোকাবিলায় চাই স্থায়ী সমাধান
0:00 / 0:00
1x