গাইবান্ধায় ৮১ ফুট উঁচু রামমূর্তি নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় আসা হরিদাস চন্দ্র তরনীদাসকে অর্থপাচার মামলায় গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ঢাকার একটি থানায় দায়ের হওয়া এই মামলায় রবিবার রাতে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। সোমবার দুপুরে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির করা হলে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত।
সিআইডি জানিয়েছে, হরিদাস এবং তার অজ্ঞাতনামা দুই থেকে তিন সহযোগী ২০২০ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩০শে জুন পর্যন্ত একটি সংঘবদ্ধ হুন্ডি চক্র পরিচালনা করতেন। দেশি-বিদেশি মুদ্রার অবৈধ লেনদেন ও স্থানান্তরের সঙ্গে তারা জড়িত ছিলেন। প্রাথমিক অনুসন্ধানে হরিদাসের পাঁচটি ব্যাংক হিসাব এবং চারটি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে প্রায় নয় কোটি ৩৫ লাখ টাকা সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। তার বৈধ আয়ের উৎস না থাকা সত্ত্বেও এই বিপুল পরিমাণ টাকা জমা ও উত্তোলনের বিষয়টি সন্দেহজনক বলে সিআইডি উল্লেখ করেছে।
সম্প্রতি গাইবান্ধায় বিশাল আকারের একটি রামমূর্তি নির্মাণকে ঘিরে হরিদাস চন্দ্র তরনীদাস নতুন করে আলোচনায় আসেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি রামচন্দ্রপুর গ্রামে ফিরে দুই একর জায়গাজুড়ে থাকা প্রাচীন একটি মন্দির সংস্কার ও আধুনিকায়নের কাজ শুরু করেন। সেখানে তিনি একটি বড় শিবমূর্তি এবং ৫১ ফুট উচ্চতার একটি কৃষ্ণমূর্তি নির্মাণ করেন, যা ২০২৫ সালের ২৬শে অক্টোবর বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার মনোজ কুমার উদ্বোধন করেন। এরপর তিনি প্রায় ৮১ ফুট উচ্চতার একটি রামমূর্তি নির্মাণের কাজ শুরু করেন, যা 'এশিয়ার সর্ববৃহৎ রাম বিগ্রহ' হবে বলে দাবি করেন।
তবে এই রামমূর্তি নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় ইমাম ও ওলামা পরিষদ আন্দোলন শুরু করলে মন্দির কমিটি প্রকল্পটি স্থগিত করে। মন্দির সংস্কার ও আধুনিকায়নে গত দেড় বছরে প্রায় ৪০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলে হরিদাস বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানান। বিপুল পরিমাণ এই অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি দাবি করেন, পুরো অর্থটাই তিনি 'ভক্তদের অনুদান' থেকে পেয়েছেন।
মি. তরনীদাস এর আগেও ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে প্রতারণা মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রটোকল কর্মকর্তার ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে বদলি বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি ও প্রতারণার মাধ্যমে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে র্যাব তাকে গ্রেফতার করেছিল। সেই সময় প্রতারণার জন্য মি. তরনীদাস 'তাওহীদ ইসলাম' নাম ধারণ করে নিজেকে মুসলমান হিসেবে পরিচয় দিতেন বলেও র্যাবের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন।
হরিদাস চন্দ্র তরনীদাসের গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামে। স্থানীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, তারা ছয় ভাই-বোন এবং বাবা গোপীনাথ তরনীদাস ছিলেন ডালি-কুলোর কারিগর। ছোটবেলা তার বেশ অভাব-অনাটনের মধ্যে কেটেছে। পুলিশ জানায়, তিনি ২০০৬ সালে এসএসসি এবং ২০০৮ সালে এইচএসসি পাস করে ভারতে চলে যান। সিআইডি'র বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০১০ সালে অবৈধভাবে ভারতে গমন করে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষে তিনি দেশে ফেরেন।
যদিও সিআইডি'র বিবৃতিতে তিনি ভারতে ঠিক কী ধরনের 'শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ' গ্রহণ করেছিলেন, তা পরিষ্কারভাবে বলা হয়নি। তবে গ্রামের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, হরিদাস ভারতে অবস্থানকালে কারিগরি বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেন। রামচন্দ্রপুর গ্রামের একজন বাসিন্দা বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমরা শুনছি যে, হরিদাস ভারতে এসি, টিভি- এগুলোর মেকানিকের কাজ করত।" দেশে ফিরে হরিদাস ঢাকার উত্তরায় এসি মেরামতের কাজ শুরু করেন।
তার মুসলিম পরিচয় ঘিরেও প্রশ্ন উঠেছে। র্যাব এবং সিআইডি উভয়ই দাবি করেছে যে, হরিদাস চন্দ্র তরনীদাস ২০১৯ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে 'তাওহীদ ইসলাম' নাম ধারণ করেন এক সবজি বিক্রেতার মেয়েকে বিয়ে করার জন্য। তবে তার গ্রামের বাসিন্দারা ভিন্ন কথা বলছেন। একজন গ্রামবাসী জানান, "আমরাও এই কথাটা শুনছিলাম। এটা নিয়ে হরিদাসকে প্রশ্নও করছি। কিন্তু সে অস্বীকার করছে।"
অভিযোগের বিষয়ে মি. তরনীদাস বা তার পরিবারের কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তার আইনজীবী শ্যামল কুমার রায় তাকে নির্দোষ দাবি করেছেন। শুনানি শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, "পুলিশ হরিদাস চন্দ্র তরনীদাসের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং আইনে একটা মামলা দিয়েছে। কিন্তু আমরা মানিলন্ডারিং আইনের সংজ্ঞার সাথে মামলার এজাহারের কোনো মিল পাইনি।"
গড় রেটিং: ০/৫ (০ ভোট)
ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ১২:০৮ অপরাহ্ণ
গাইবান্ধায় ৮১ ফুট উঁচু রামমূর্তি নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় আসা হরিদাস চন্দ্র তরনীদাসকে অর্থপাচার মামলায় গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ঢাকার একটি থানায় দায়ের হওয়া এই মামলায় রবিবার রাতে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। সোমবার দুপুরে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির করা হলে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত।
সিআইডি জানিয়েছে, হরিদাস এবং তার অজ্ঞাতনামা দুই থেকে তিন সহযোগী ২০২০ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩০শে জুন পর্যন্ত একটি সংঘবদ্ধ হুন্ডি চক্র পরিচালনা করতেন। দেশি-বিদেশি মুদ্রার অবৈধ লেনদেন ও স্থানান্তরের সঙ্গে তারা জড়িত ছিলেন। প্রাথমিক অনুসন্ধানে হরিদাসের পাঁচটি ব্যাংক হিসাব এবং চারটি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে প্রায় নয় কোটি ৩৫ লাখ টাকা সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। তার বৈধ আয়ের উৎস না থাকা সত্ত্বেও এই বিপুল পরিমাণ টাকা জমা ও উত্তোলনের বিষয়টি সন্দেহজনক বলে সিআইডি উল্লেখ করেছে।
সম্প্রতি গাইবান্ধায় বিশাল আকারের একটি রামমূর্তি নির্মাণকে ঘিরে হরিদাস চন্দ্র তরনীদাস নতুন করে আলোচনায় আসেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি রামচন্দ্রপুর গ্রামে ফিরে দুই একর জায়গাজুড়ে থাকা প্রাচীন একটি মন্দির সংস্কার ও আধুনিকায়নের কাজ শুরু করেন। সেখানে তিনি একটি বড় শিবমূর্তি এবং ৫১ ফুট উচ্চতার একটি কৃষ্ণমূর্তি নির্মাণ করেন, যা ২০২৫ সালের ২৬শে অক্টোবর বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার মনোজ কুমার উদ্বোধন করেন। এরপর তিনি প্রায় ৮১ ফুট উচ্চতার একটি রামমূর্তি নির্মাণের কাজ শুরু করেন, যা 'এশিয়ার সর্ববৃহৎ রাম বিগ্রহ' হবে বলে দাবি করেন।
তবে এই রামমূর্তি নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় ইমাম ও ওলামা পরিষদ আন্দোলন শুরু করলে মন্দির কমিটি প্রকল্পটি স্থগিত করে। মন্দির সংস্কার ও আধুনিকায়নে গত দেড় বছরে প্রায় ৪০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলে হরিদাস বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানান। বিপুল পরিমাণ এই অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি দাবি করেন, পুরো অর্থটাই তিনি 'ভক্তদের অনুদান' থেকে পেয়েছেন।
মি. তরনীদাস এর আগেও ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে প্রতারণা মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রটোকল কর্মকর্তার ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে বদলি বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি ও প্রতারণার মাধ্যমে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে র্যাব তাকে গ্রেফতার করেছিল। সেই সময় প্রতারণার জন্য মি. তরনীদাস 'তাওহীদ ইসলাম' নাম ধারণ করে নিজেকে মুসলমান হিসেবে পরিচয় দিতেন বলেও র্যাবের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন।
হরিদাস চন্দ্র তরনীদাসের গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামে। স্থানীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, তারা ছয় ভাই-বোন এবং বাবা গোপীনাথ তরনীদাস ছিলেন ডালি-কুলোর কারিগর। ছোটবেলা তার বেশ অভাব-অনাটনের মধ্যে কেটেছে। পুলিশ জানায়, তিনি ২০০৬ সালে এসএসসি এবং ২০০৮ সালে এইচএসসি পাস করে ভারতে চলে যান। সিআইডি'র বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০১০ সালে অবৈধভাবে ভারতে গমন করে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষে তিনি দেশে ফেরেন।
যদিও সিআইডি'র বিবৃতিতে তিনি ভারতে ঠিক কী ধরনের 'শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ' গ্রহণ করেছিলেন, তা পরিষ্কারভাবে বলা হয়নি। তবে গ্রামের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, হরিদাস ভারতে অবস্থানকালে কারিগরি বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেন। রামচন্দ্রপুর গ্রামের একজন বাসিন্দা বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমরা শুনছি যে, হরিদাস ভারতে এসি, টিভি- এগুলোর মেকানিকের কাজ করত।" দেশে ফিরে হরিদাস ঢাকার উত্তরায় এসি মেরামতের কাজ শুরু করেন।
তার মুসলিম পরিচয় ঘিরেও প্রশ্ন উঠেছে। র্যাব এবং সিআইডি উভয়ই দাবি করেছে যে, হরিদাস চন্দ্র তরনীদাস ২০১৯ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে 'তাওহীদ ইসলাম' নাম ধারণ করেন এক সবজি বিক্রেতার মেয়েকে বিয়ে করার জন্য। তবে তার গ্রামের বাসিন্দারা ভিন্ন কথা বলছেন। একজন গ্রামবাসী জানান, "আমরাও এই কথাটা শুনছিলাম। এটা নিয়ে হরিদাসকে প্রশ্নও করছি। কিন্তু সে অস্বীকার করছে।"
অভিযোগের বিষয়ে মি. তরনীদাস বা তার পরিবারের কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তার আইনজীবী শ্যামল কুমার রায় তাকে নির্দোষ দাবি করেছেন। শুনানি শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, "পুলিশ হরিদাস চন্দ্র তরনীদাসের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং আইনে একটা মামলা দিয়েছে। কিন্তু আমরা মানিলন্ডারিং আইনের সংজ্ঞার সাথে মামলার এজাহারের কোনো মিল পাইনি।"
