দেশে গত কয়েক বছরে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। এর সাথে পাল্লা দিয়ে কিছু ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠায় তাদের একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর আওতায় আনার দাবি উঠেছে। এই লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।
সম্প্রতি (৮ জুন) জাতীয় সংসদে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানান, সাংবাদিকদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ এবং নিবন্ধনের আওতায় আনার প্রস্তাব রেখে ১৯৭৪ সালের প্রেস কাউন্সিল আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তথ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণার পর থেকেই সংবাদমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের মনে নানা প্রশ্ন ও শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি কেমন হবে, কারা এই প্রক্রিয়ার দায়িত্বে থাকবেন এবং কী কী শর্তারোপ করা হবে—তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো রূপরেখা না পাওয়ায় ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি বাড়ছে গভীর উদ্বেগ।
নিবন্ধন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’-এর উপদেষ্টা সম্পাদক ইলিয়াস খান। তিনি বলেন, "যে মানুষগুলো নিবন্ধন করার দায়িত্বে থাকবেন, তাদের সততার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষাবলম্বনকারী সাংবাদিকদের গুরুত্ব দেওয়ার যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা অমূলক নয়। তেমনটি হলে প্রকৃত মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হবে।"
সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান মনে করেন, সাংবাদিকদের মূল সমস্যাগুলো এড়িয়ে এই ধরণের উদ্যোগ হিতে বিপরীত হতে পারে। তিনি বলেন, "যেখানে বছরের পর বছর ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন হয় না, সাংবাদিকদের নিয়মিত বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয় না, সেখানে নতুন করে নিবন্ধনের নামে আরেকটি সীমাবদ্ধতার বেড়াজাল তৈরি করা বোমেরাং হতে পারে।"
সম্পাদক ও সাংবাদিক নেতা ইলিয়াস খানের মতে, সাংবাদিকতার বর্তমান সংকট কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা রাজনীতিবিদদের দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। বরং পেশাদার সাংবাদিকদের সাথে আলোচনা করেই সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সাথে গণমাধ্যমগুলো কীভাবে চলছে, কারা চালাচ্ছে এবং এর পেছনে মালিক কারা—সেসব বিষয় খতিয়ে দেখা বেশি জরুরি।
দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা পেশা ও শিক্ষকতায় যুক্ত থাকা অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান মনে করেন, সংকট সমাধানে কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অগ্রাধিকার না দিয়ে সাংবাদিকদের জরুরি সমস্যায় মনোযোগ দেওয়া দরকার। গণতান্ত্রিক চর্চায় গণমাধ্যমের ভূমিকাকে আরও শক্তিশালী ও নিয়মতান্ত্রিক করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "পেশাগতভাবে যারা এখানে দায়বদ্ধ এবং যেসব সাংবাদিক ইউনিয়ন রয়েছে, তাদেরকেই নিজেদের প্রতিষ্ঠান সমৃদ্ধ করার নিয়মকানুন তৈরির দায়িত্ব দেওয়া উচিত। সরকার থেকে কিছু চাপিয়ে দিলে তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাংবাদিকদের জন্য যৌক্তিক হবে না।"
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে সাংবাদিক নিবন্ধনের আলোচনা জোরদার হলেও গণমাধ্যমকর্মীদের মৌলিক অধিকারগুলো এখনো উপেক্ষিত। বেশিরভাগ জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকায় এখনো ওয়েজবোর্ড কার্যকর হয়নি। দেশের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকা সম্প্রচার বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের জন্য নেই কোনো আলাদা বেতন কাঠামো। এমনকি দেশের প্রচলিত শ্রম আইনের বেশিরভাগ সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন সিংহভাগ গণমাধ্যমকর্মী। এই মূল সংকটগুলো সমাধান না করে কেবল নিবন্ধনের ওপর জোর দেওয়াকে সাংবাদিকতার স্বাধীনতায় নতুন হস্তক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
গড় রেটিং: ৫/৫ (১ ভোট)
ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৪ পূর্বাহ্ণ
দেশে গত কয়েক বছরে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। এর সাথে পাল্লা দিয়ে কিছু ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠায় তাদের একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর আওতায় আনার দাবি উঠেছে। এই লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।
সম্প্রতি (৮ জুন) জাতীয় সংসদে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানান, সাংবাদিকদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ এবং নিবন্ধনের আওতায় আনার প্রস্তাব রেখে ১৯৭৪ সালের প্রেস কাউন্সিল আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তথ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণার পর থেকেই সংবাদমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের মনে নানা প্রশ্ন ও শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি কেমন হবে, কারা এই প্রক্রিয়ার দায়িত্বে থাকবেন এবং কী কী শর্তারোপ করা হবে—তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো রূপরেখা না পাওয়ায় ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি বাড়ছে গভীর উদ্বেগ।
নিবন্ধন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’-এর উপদেষ্টা সম্পাদক ইলিয়াস খান। তিনি বলেন, "যে মানুষগুলো নিবন্ধন করার দায়িত্বে থাকবেন, তাদের সততার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষাবলম্বনকারী সাংবাদিকদের গুরুত্ব দেওয়ার যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা অমূলক নয়। তেমনটি হলে প্রকৃত মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হবে।"
সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান মনে করেন, সাংবাদিকদের মূল সমস্যাগুলো এড়িয়ে এই ধরণের উদ্যোগ হিতে বিপরীত হতে পারে। তিনি বলেন, "যেখানে বছরের পর বছর ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন হয় না, সাংবাদিকদের নিয়মিত বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয় না, সেখানে নতুন করে নিবন্ধনের নামে আরেকটি সীমাবদ্ধতার বেড়াজাল তৈরি করা বোমেরাং হতে পারে।"
সম্পাদক ও সাংবাদিক নেতা ইলিয়াস খানের মতে, সাংবাদিকতার বর্তমান সংকট কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা রাজনীতিবিদদের দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। বরং পেশাদার সাংবাদিকদের সাথে আলোচনা করেই সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সাথে গণমাধ্যমগুলো কীভাবে চলছে, কারা চালাচ্ছে এবং এর পেছনে মালিক কারা—সেসব বিষয় খতিয়ে দেখা বেশি জরুরি।
দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা পেশা ও শিক্ষকতায় যুক্ত থাকা অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান মনে করেন, সংকট সমাধানে কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অগ্রাধিকার না দিয়ে সাংবাদিকদের জরুরি সমস্যায় মনোযোগ দেওয়া দরকার। গণতান্ত্রিক চর্চায় গণমাধ্যমের ভূমিকাকে আরও শক্তিশালী ও নিয়মতান্ত্রিক করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "পেশাগতভাবে যারা এখানে দায়বদ্ধ এবং যেসব সাংবাদিক ইউনিয়ন রয়েছে, তাদেরকেই নিজেদের প্রতিষ্ঠান সমৃদ্ধ করার নিয়মকানুন তৈরির দায়িত্ব দেওয়া উচিত। সরকার থেকে কিছু চাপিয়ে দিলে তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাংবাদিকদের জন্য যৌক্তিক হবে না।"
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে সাংবাদিক নিবন্ধনের আলোচনা জোরদার হলেও গণমাধ্যমকর্মীদের মৌলিক অধিকারগুলো এখনো উপেক্ষিত। বেশিরভাগ জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকায় এখনো ওয়েজবোর্ড কার্যকর হয়নি। দেশের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকা সম্প্রচার বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের জন্য নেই কোনো আলাদা বেতন কাঠামো। এমনকি দেশের প্রচলিত শ্রম আইনের বেশিরভাগ সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন সিংহভাগ গণমাধ্যমকর্মী। এই মূল সংকটগুলো সমাধান না করে কেবল নিবন্ধনের ওপর জোর দেওয়াকে সাংবাদিকতার স্বাধীনতায় নতুন হস্তক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
