রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬
ONE NEWS EXPRESS

লাশের নিয়েও বাণিজ্য: ময়নাতদন্তের পদে পদে টাকার খেলা

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল মর্গে নীরব চাঁদাবাজি


মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ
মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ সহ-সম্পাদক
প্রকাশ : বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ | প্রিন্ট | ডাউনলোড কার্ড

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল মর্গে নীরব চাঁদাবাজি

অস্বাভাবিক, আকস্মিক কিংবা প্রশ্নবিদ্ধ কোনো মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং আইনি ধাপ হলো ময়নাতদন্ত। কিন্তু রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোর মর্গে এই স্পর্শকাতর প্রক্রিয়াটিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে এক ভয়ংকর ও নীরব চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট। বিশেষ করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে এসে নিহতদের শোকগ্রস্ত স্বজনরা প্রতিনিয়ত পড়ছেন চরম ভোগান্তি ও আর্থিক ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মুখে। অভিযোগ উঠেছে, এই মর্গের পুরো অনিয়ম টিকিয়ে রাখতে হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ও চিকিৎসক মর্গ থেকে প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা মাসোহারা নেন।

রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোর মর্গে ময়নাতদন্ত ঘিরে হয়রানির যেন শেষ নেই। অনিয়ম ও দুর্নীতি সেখানে অনেকটাই অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। ভুক্তভোগীদের আক্ষেপ, ‘এখানে মানুষের মরার পরও যেন শান্তি নেই।’ স্বজনদের অভিযোগ, টাকা ছাড়া ময়নাতদন্তের ফাইল এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে এগোয় না। মর্গের সহকারীদের লাশ গ্রহণ, হিমঘরে সংরক্ষণ থেকে শুরু করে কাটার পর সেলাই করা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ধাপে অবৈধভাবে অর্থ দিতে হয়। একটি ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করতে নিহতের পরিবারকে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা, ক্ষেত্রবিশেষে তারও বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে।

ভুক্তভোগী এক স্বজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "হাসপাতালে লাশ নামাতে টাকা দিতে হয়, আবার ময়নাতদন্ত শেষে লাশ গাড়ি বা অ্যাম্বুলেন্সে উঠাতেও বকশিশ দিতে হয়। সরকারি হাসপাতালে যদি এভাবে ডাকাতদের মতো টাকা চাওয়া হয়, তাহলে সাধারণ গরিব মানুষ কোথায় যাবে?"

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মর্গে সবচেয়ে গুরুতর অনিয়ম চলছে। সেখানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সহকারী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত একমাত্র ব্যক্তি জীবন ওরফে জানু লাল। আর তার সঙ্গে সহকারী হিসেবে কাজ করেন সেলিনা নামে এক বহিরাগত নারী। সরকারি কোনো বৈধ পদ না থাকলেও এই জীবন ও সেলিনাই মূলত পুরো মর্গের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন। আর তাদের এই প্রকাশ্য অনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. নাশাত জাবীনের বিরুদ্ধে।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত করতে এলে স্বজনদের হাতে একটি পণ্যের লম্বা তালিকা ধরিয়ে দেন জানু লাল। সেই তালিকায় থাকা বাজারের ব্যাগ, হুইল পাউডার, ডেটল, সাবানসহ বিভিন্ন পণ্য মর্গের পাশের একটি নির্দিষ্ট দোকান থেকেই কিনতে বাধ্য করা হয়। মূলত ওই নির্দিষ্ট দোকানদারের সঙ্গে এই সিন্ডিকেটের আর্থিক সমঝোতা রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কেনা পণ্যের অনেকগুলোই ময়নাতদন্তের কাজে মোটেও ব্যবহার করা হয় না। পরবর্তীতে ব্যবহার না করা সেসব পণ্য আবার একই দোকানে ফেরত দিয়ে ক্যাশ টাকা বুঝে নেয় এই চক্র।

এই চক্রের ভেতরের অনিয়মের সত্যতা জানতে অনুসন্ধানে নামে One News Express। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে মর্গের এক কর্মচারী জানান, সেখানে কাজ করতে হলে ফরেনসিক বিভাগের প্রধানকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট করে ৩০ হাজার টাকা দিতে হয়। ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় তার বিরুদ্ধে সাধারণ কর্মচারীরা মুখ খোলার সাহস পান না। কর্মচারীরা জানান, এই ফিক্সড মাসোহারার টাকা জোগাড় করতেই তারা মূলত লাশ নিয়ে আসা স্বজনদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। টাকা দিতে দেরি বা অস্বীকার করলে "লাশ সেলাই করা হবে না" বা "রিপোর্ট আটকে থাকবে" বলে ভয় দেখানো হয়।

আরও ভয়াবহ তথ্য হলো, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে যারা কাজ করেন, তাদের সিংহভাগই সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত নন। অথচ তাদের ওপর চাপ দিয়ে প্রতি মাসে এই ৩০ হাজার টাকা নিয়ম করে আদায় করেন ফরেনসিক চিকিৎসক ডা. নাশাত জাবীন।

এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ডা. নাশাত জাবীনের মুখোমুখি হওয়া হলে তিনি প্রথমে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান এবং বলেন, হাসপাতালের অধ্যক্ষের অনুমতি ছাড়া তিনি কোনো মন্তব্য করবেন না। পরবর্তীতে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর হাসপাতালের অধ্যক্ষও বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে দুই দিন পরে আসতে বলেন।

অধ্যক্ষের কক্ষ থেকে বের হওয়ার সময় পুনরায় অভিযোগের বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চাইলে ডা. নাশাত জাবীন ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, "আমি অধ্যক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো কথা বলব না। আপনাদের কোনো তথ্য দরকার হলে তথ্য অধিকার আইনের ফরম ফিলআপ করে নিয়ে আসেন।"

হত্যা, আত্মহত্যা কিংবা যেকোনো রহস্যজনক মৃত্যুর ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রথম চাবিকাঠি হলো একটি সঠিক ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন। কিন্তু সেই স্পর্শকাতর প্রক্রিয়াটিই এখন দুর্নীতি আর অসাধু চক্রের রাহুগ্রাসে বন্দি। স্বজন হারানো শোকার্ত মানুষদের এই নির্মম হয়রানি থেকে মুক্ত করতে সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কবে কার্যকর নজরদারি ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেবে—এখন সেটিই লাখ টাকার প্রশ্ন।


এই সংবাদটি আপনার কেমন লেগেছে?


খবরটি রেটিং দিন

গড় রেটিং: /৫ ( ভোট)

ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

ONE NEWS EXPRESS

রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬


সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল মর্গে নীরব চাঁদাবাজি

প্রকাশের তারিখ : বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ

featured Image

অস্বাভাবিক, আকস্মিক কিংবা প্রশ্নবিদ্ধ কোনো মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং আইনি ধাপ হলো ময়নাতদন্ত। কিন্তু রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোর মর্গে এই স্পর্শকাতর প্রক্রিয়াটিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে এক ভয়ংকর ও নীরব চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট। বিশেষ করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে এসে নিহতদের শোকগ্রস্ত স্বজনরা প্রতিনিয়ত পড়ছেন চরম ভোগান্তি ও আর্থিক ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মুখে। অভিযোগ উঠেছে, এই মর্গের পুরো অনিয়ম টিকিয়ে রাখতে হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ও চিকিৎসক মর্গ থেকে প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা মাসোহারা নেন।

রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোর মর্গে ময়নাতদন্ত ঘিরে হয়রানির যেন শেষ নেই। অনিয়ম ও দুর্নীতি সেখানে অনেকটাই অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। ভুক্তভোগীদের আক্ষেপ, ‘এখানে মানুষের মরার পরও যেন শান্তি নেই।’ স্বজনদের অভিযোগ, টাকা ছাড়া ময়নাতদন্তের ফাইল এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে এগোয় না। মর্গের সহকারীদের লাশ গ্রহণ, হিমঘরে সংরক্ষণ থেকে শুরু করে কাটার পর সেলাই করা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ধাপে অবৈধভাবে অর্থ দিতে হয়। একটি ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করতে নিহতের পরিবারকে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা, ক্ষেত্রবিশেষে তারও বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে।

ভুক্তভোগী এক স্বজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "হাসপাতালে লাশ নামাতে টাকা দিতে হয়, আবার ময়নাতদন্ত শেষে লাশ গাড়ি বা অ্যাম্বুলেন্সে উঠাতেও বকশিশ দিতে হয়। সরকারি হাসপাতালে যদি এভাবে ডাকাতদের মতো টাকা চাওয়া হয়, তাহলে সাধারণ গরিব মানুষ কোথায় যাবে?"

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মর্গে সবচেয়ে গুরুতর অনিয়ম চলছে। সেখানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সহকারী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত একমাত্র ব্যক্তি জীবন ওরফে জানু লাল। আর তার সঙ্গে সহকারী হিসেবে কাজ করেন সেলিনা নামে এক বহিরাগত নারী। সরকারি কোনো বৈধ পদ না থাকলেও এই জীবন ও সেলিনাই মূলত পুরো মর্গের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন। আর তাদের এই প্রকাশ্য অনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. নাশাত জাবীনের বিরুদ্ধে।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত করতে এলে স্বজনদের হাতে একটি পণ্যের লম্বা তালিকা ধরিয়ে দেন জানু লাল। সেই তালিকায় থাকা বাজারের ব্যাগ, হুইল পাউডার, ডেটল, সাবানসহ বিভিন্ন পণ্য মর্গের পাশের একটি নির্দিষ্ট দোকান থেকেই কিনতে বাধ্য করা হয়। মূলত ওই নির্দিষ্ট দোকানদারের সঙ্গে এই সিন্ডিকেটের আর্থিক সমঝোতা রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কেনা পণ্যের অনেকগুলোই ময়নাতদন্তের কাজে মোটেও ব্যবহার করা হয় না। পরবর্তীতে ব্যবহার না করা সেসব পণ্য আবার একই দোকানে ফেরত দিয়ে ক্যাশ টাকা বুঝে নেয় এই চক্র।

এই চক্রের ভেতরের অনিয়মের সত্যতা জানতে অনুসন্ধানে নামে One News Express। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে মর্গের এক কর্মচারী জানান, সেখানে কাজ করতে হলে ফরেনসিক বিভাগের প্রধানকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট করে ৩০ হাজার টাকা দিতে হয়। ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় তার বিরুদ্ধে সাধারণ কর্মচারীরা মুখ খোলার সাহস পান না। কর্মচারীরা জানান, এই ফিক্সড মাসোহারার টাকা জোগাড় করতেই তারা মূলত লাশ নিয়ে আসা স্বজনদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। টাকা দিতে দেরি বা অস্বীকার করলে "লাশ সেলাই করা হবে না" বা "রিপোর্ট আটকে থাকবে" বলে ভয় দেখানো হয়।

আরও ভয়াবহ তথ্য হলো, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে যারা কাজ করেন, তাদের সিংহভাগই সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত নন। অথচ তাদের ওপর চাপ দিয়ে প্রতি মাসে এই ৩০ হাজার টাকা নিয়ম করে আদায় করেন ফরেনসিক চিকিৎসক ডা. নাশাত জাবীন।

এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ডা. নাশাত জাবীনের মুখোমুখি হওয়া হলে তিনি প্রথমে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান এবং বলেন, হাসপাতালের অধ্যক্ষের অনুমতি ছাড়া তিনি কোনো মন্তব্য করবেন না। পরবর্তীতে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর হাসপাতালের অধ্যক্ষও বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে দুই দিন পরে আসতে বলেন।

অধ্যক্ষের কক্ষ থেকে বের হওয়ার সময় পুনরায় অভিযোগের বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চাইলে ডা. নাশাত জাবীন ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, "আমি অধ্যক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো কথা বলব না। আপনাদের কোনো তথ্য দরকার হলে তথ্য অধিকার আইনের ফরম ফিলআপ করে নিয়ে আসেন।"

হত্যা, আত্মহত্যা কিংবা যেকোনো রহস্যজনক মৃত্যুর ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রথম চাবিকাঠি হলো একটি সঠিক ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন। কিন্তু সেই স্পর্শকাতর প্রক্রিয়াটিই এখন দুর্নীতি আর অসাধু চক্রের রাহুগ্রাসে বন্দি। স্বজন হারানো শোকার্ত মানুষদের এই নির্মম হয়রানি থেকে মুক্ত করতে সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কবে কার্যকর নজরদারি ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেবে—এখন সেটিই লাখ টাকার প্রশ্ন।



ONE NEWS EXPRESS

সম্পাদক ও প্রকাশক- মো: মনিরুজ্জামান
সহ-সম্পাদক: তুহিন আহসান
বার্তা সম্পাদক: তামিমা জান্নাত

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল মর্গে নীরব চাঁদাবাজি
0:00 / 0:00
1x