রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
ONE NEWS EXPRESS

হ'ত্যা'র পর পুকুরে গোসল করে পালায় অটোরিকশা চালক

কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল তাজমীনকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিশোরীকে হত্যার পর ঘটনাস্থলে অটোরিকশা ফেলে রেখে একটি পুকুরে গোসল করে পালিয়ে যায় অভিযুক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া। পরে নিহতের ব্যবহৃত একটি আইফোন ও ভ্যানিটি ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টায় কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া। তিনি বলেন, ঘটনাটি তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ অভিযুক্ত চালককে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বেশ কিছু আলামতও উদ্ধার করা হয়েছে। ধানক্ষেত থেকে কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার পুলিশ জানায়, গত ৮ অক্টোবর কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর চরপাড়া গ্রামের একটি ধানক্ষেতের পাশ থেকে জান্নাতুল তাজমীনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় থানায় হত্যা মামলা দায়েরের পর জেলা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে।   তদন্তের একপর্যায়ে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম থেকে অটোরিকশাচালক সুমন মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেছেন। তবে ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করতে ফরেনসিক প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ।   নিহত তাজমীন সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার গ্রামের বাড়ি যশোর জেলায়। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় বসবাস করত সে। ৩০০ টাকায় অটোরিকশা ভাড়া, এরপর পথ পরিবর্তন পুলিশের ব্রিফিংয়ে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার রাতে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডের তিশা বাস কাউন্টারের সামনে থেকে রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে তাজমীন। চালক সুমন মিয়া ভাড়া হিসেবে ৫০০ টাকা দাবি করলে শেষ পর্যন্ত ৩০০ টাকায় যাওয়ার চুক্তি হয়। যাত্রাপথে একটি দোকান থেকে ১০০ টাকা দিয়ে চালকের জন্য রুটি ও কলা কিনে আনতে দেয় কিশোরী। এরপর তারা গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছুদূর যাওয়ার পর শর্টকাট পথে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে চালক নূরজাহান হোটেলের সামনে দিয়ে ইউটার্ন নিয়ে চাঁদপুর সড়কের দিকে চলে যায়। পরে বিজরা বাজার হয়ে নির্জন এলাকার দিকে অগ্রসর হয় সে। একপর্যায়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে অটোরিকশার ইঞ্জিন বন্ধ করে দেয় চালক। জায়গাটি অপরিচিত হওয়ায় তাজমীন কারণ জানতে চাইলে তাকে জানানো হয়, সেটি রেসকোর্স এলাকা নয়। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে কিশোরী অটোরিকশা থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করে। চিৎকারের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধরে, ধস্তাধস্তি পুলিশের দেওয়া প্রাথমিক তদন্তের বিবরণ অনুযায়ী, তাজমীনকে আটকে রাখার চেষ্টা করলে সে চিৎকার শুরু করে। এ সময় চালক সুমন তার গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধরে। একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয় এবং কিশোরী দুর্বল হয়ে পড়ে। পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে। এরপর তাজমীনকে ধানক্ষেতে নিয়ে গিয়ে মাথায় পা দিয়ে চেপে ধরে তার মৃত্যু নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে সে। তবে ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে প্রয়োজনীয় ফরেনসিক প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। হত্যার পর পুকুরে গোসল, পরে চট্টগ্রামে পালিয়ে যায় পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর তাজমীনের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটি আইফোন নিয়ে নেয় অভিযুক্ত সুমন। ব্যাগটি ধানক্ষেতে ফেলে রেখে অটোরিকশাটিও ঘটনাস্থলে ফেলে যায় সে। এরপর কাঁচিকাটা মসজিদের সামনের একটি পুকুরে গোসল করে সেখান থেকে অন্য একটি ভাড়ায়চালিত অটোরিকশায় বাখরাবাদ এলাকায় যায়। সেখানে পুকুরপাড়ের একটি জঙ্গলে আইফোনটি লুকিয়ে রেখে পরে চট্টগ্রামে পালিয়ে যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর অভিযুক্তের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কুমিল্লার বাখরাবাদ এলাকার ওই জঙ্গল থেকে তাজমীনের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি ধানক্ষেত থেকে তার ভ্যানিটি ব্যাগও উদ্ধার করেছে পুলিশ। বাবাকে ‘লাইভ লোকেশন’ পাঠিয়েছিল তাজমীন সংবাদ ব্রিফিংয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া জানান, রাত ২টা ৫৮ মিনিটে তাজমীন তার বাবার সঙ্গে নিজের ‘লাইভ লোকেশন’ শেয়ার করেছিল। তবে তার বাবা তাৎক্ষণিকভাবে সেটি দেখতে পাননি। ভোরের দিকে লোকেশনটি দেখার পর তিনি ওই এলাকায় মেয়েকে খুঁজতে যান। ঘটনাস্থল থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজও পুলিশের হাতে এসেছে। ওই ফুটেজে তাজমীনকে অটোরিকশার ভেতরে শান্ত অবস্থায় বসে থাকতে দেখা গেছে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা। অটোরিকশায় চালক ছাড়া অন্য কেউ ছিল কি না, তা নিয়েও সন্দেহের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তবে এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য-প্রমাণে শুধু চালক সুমনের সংশ্লিষ্টতাই পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। নিখোঁজ থাকার চার দিন নিয়ে তদন্ত পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তাজমীন গত ৪ অক্টোবর থেকে নিখোঁজ ছিল। তবে এ বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা কোনো অভিযোগ করা হয়নি বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। এই চার দিন তাজমীন কোথায় ছিল, কার সঙ্গে ছিল এবং কেউ তাকে কোনোভাবে প্রভাবিত বা প্ররোচিত করেছিল কি না—এসব বিষয়ও তদন্ত করে দেখছে পুলিশ। এ ছাড়া উদ্ধার হওয়া আইফোনটি কীভাবে তার কাছে এসেছিল এবং সেটি পরিবার কিনে দিয়েছিল কি না, সে বিষয়েও নিহতের বাবার সঙ্গে কথা বলে তথ্য যাচাই করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। ফরেনসিক প্রতিবেদনের অপেক্ষায় পুলিশ পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। তবে ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হতে ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।   একটি কিশোরীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু এলাকায় শোক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে রাতের যাতায়াতে নিরাপত্তা, নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা দ্রুত পুলিশকে জানানোর গুরুত্ব এবং নারী ও শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।   তদন্তের পরবর্তী ধাপে উদ্ধার হওয়া আলামত, সিসিটিভি ফুটেজ, ফরেনসিক প্রতিবেদন ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র নিশ্চিত করার অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্টরা।  

হ'ত্যা'র পর পুকুরে গোসল করে পালায় অটোরিকশা চালক