রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
ONE NEWS EXPRESS

ঐতিহ্যে ভ্যানের শহর নাজিরপুর

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে হয়তো একদিন ভ্যানের ব্যবহার কমে আসবে। কিন্তু নাজিরপুরের ইতিহাস, মানুষের স্মৃতি আর জনজীবনের গল্পে এই বাহনের জায়গাটি থেকে যাবে—ঐতিহ্যের চাকা হয়ে। তবে এই ঐতিহ্যের একটি উল্টো দিকও রয়েছে। বর্ষা এলেই নাজিরপুরের ভ্যানযাত্রা হয়ে ওঠে ভোগান্তির। ভ্যানের ওপর কোনো ছাউনি না থাকায় বৃষ্টির মধ্যে যাত্রীদের ভিজেই গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের জন্য পরিস্থিতি হয় বেশ দুর্ভোগের। হঠাৎ বৃষ্টি নামলে ভ্যানযাত্রীরা অনেক সময় আশ্রয় নেওয়ার সুযোগও পান না। মাথার ওপর বৃষ্টির পানি, চারপাশে কাদা-পানি আর ভেজা পোশাকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। এতে ঠান্ডা, জ্বরসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয় স্থানীয়দের । পাশাপাশি বৃষ্টিতে ভিজে অনেক সময় নষ্ট হয় যাত্রীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, বাজারের পণ্য কিংবা অন্যান্য সামগ্রী। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—যে ভ্যান এ অঞ্চলের মানুষের স্বস্তির বাহন , বর্ষাকালে সেটিই অনেকের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ সামান্য উদ্যোগেই এই সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব। ভ্যানের ওপর টেকসই ছাউনি, পানি নিরোধক ত্রিপল বা স্বচ্ছ প্লাস্টিকের আবরণ ব্যবহার করা যেতে পারে। এমনভাবে ছাউনি তৈরি করা দরকার, যাতে বৃষ্টি থেকে যাত্রীরা সুরক্ষা পান, আবার ভ্যানের ভেতরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসও চলাচল করতে পারে। স্থানীয় ভ্যানচালকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে স্বল্প খরচে ভ্যানে নিরাপদ ছাউনি তৈরির জন্য বিশেষ উদ্যোগ বা সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। কারন ঐতিহ্য ধরে রাখার অর্থ শুধু পুরোনো কোনো ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা নয়; ঐতিহ্যের সঙ্গে মানুষের নিরাপত্তা ও স্বস্তিকেও নিশ্চিত করা। নাজিরপুরের ভ্যানগাড়ি এই জনপদের পরিচয় ও ঐতিহ্যের অংশ। তাই এর ব্যবহার বন্ধ করা নয়, বরং প্রয়োজন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এটিকে আরও নিরাপদ ও যাত্রীবান্ধব করা। নাজিরপুরে বসবাসরত জনসাধারণ ও সচেতন মহলের দাবী নাজিরপুরের ঐতিহ্য এই তিন চাকার যানবাহন ভ্যান গাড়ি টিকে থাকুক আরও বহু বছর। তবে বৃষ্টিতে ভিজে নয়, নিরাপদ, স্বস্তি আর ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে। আপনার আমার চোখে ভ্যান একটি সাধারণ যানবাহন। কখনো কখনো একটি যানবাহনও হয়ে উঠতে পারে একটি এলাকার প্রতিচ্ছবি। তেমনটাই ঘটেছে পিরোজপুর এর নাজিরপুর উপজেলায়। ভ্যানগাড়ির শহর হিসেবে নাজিরপুর এর রয়েছে আলাদা পরিচিতি। নাজিরপুর সদর শহর সহ পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন এর পথঘাট, বাজার আর মানুষের নিত্যদিনের চলাচলের সঙ্গে মিশে আছে ভ্যানের চাকা। সময়ের সঙ্গে আধুনিক যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও নাজিরপুরের মানুষের কাছে ভ্যান এখনো শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এটি তাদের জীবনযাত্রা ও স্থানীয় সংস্কৃতিরও একটি অংশ। সকাল হলেই নাজিরপুরের বিভিন্ন সড়কে শুরু হয় ভ্যানের ব্যস্ততা। কেউ বাজারে যাচ্ছেন, কেউ বাড়ির প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে ফিরছেন, আবার কেউবা পণ্য পরিবহনের কাজে ছুটছেন। স্বল্প খরচে মানুষের গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভ্যানের বিকল্প নাজিরপুরে এখনো অনেকটাই অপ্রতিদ্বন্দ্বী। স্থানীয়দের ভাষায়, “নাজিরপুরের ভ্যান শুধু একটি যানবাহন নয়, এটি এ এলাকার ঐতিহ্য।” এই ভ্যানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু মানুষের জীবিকা। ভ্যানচালকদের ঘাম আর শ্রমে সচল থাকে গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বাজারে পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই ভ্যানের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে নাজিরপুরও। মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে। তবুও ভ্যানের আবেদন একটুও কমেনি এ অঞ্চলের মানুষের কাছে। বিশেষ করে গ্রামের সরু রাস্তা, কাঁচা পথ কিংবা বাড়ির কাছের গন্তব্যে ভ্যান এখনো মানুষের সহজ ও নির্ভরযোগ্য বাহন।নাজিরপুরের ভ্যানের গল্প আসলে এখানকার মানুষের গল্প। এই চাকার ঘূর্ণনের সঙ্গে মিশে আছে শ্রমজীবী মানুষের স্বপ্ন, কৃষকের ঘাম, বাজারের কোলাহল আর গ্রামীণ জীবনের চেনা ছন্দ। তাই নাজিরপুরকে যদি বলা হয় ‘ভ্যানগাড়ির শহর’, তবে সেটি শুধু একটি উপাধি নয়—এটি এই জনপদের জীবন ও ঐতিহ্যেরই প্রতিচ্ছবি।

ঐতিহ্যে ভ্যানের শহর নাজিরপুর