রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬
ONE NEWS EXPRESS

চাকরি

মাদকের সহজলভ্যতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

 একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার তরুণ প্রজন্মের মানসিক, শারীরিক ও নৈতিক বিকাশের ওপর। সেই প্রজন্ম যদি মাদকাসক্তির ঝুঁকিতে পড়ে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু ব্যক্তি বা পরিবার নয়; বিপন্ন হয়ে পড়ে রাষ্ট্রের মানবসম্পদ, অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় মাদকের সহজলভ্যতা তাই শুধু আইন-শৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি একটি গভীর জাতীয় উন্নয়ন-সংকট।প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাদক উদ্ধার, মাদক কারবারি গ্রেপ্তার এবং মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধের খবর প্রকাশিত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র এ বিষয়ে সক্রিয়। কিন্তু একই সঙ্গে এসব ঘটনাই আরেকটি বাস্তবতা সামনে আনে—চাহিদা ও সরবরাহের এই চক্র এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এর অর্থ, শুধু অভিযান নয়; সমস্যার সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত ও স্বাস্থ্যগত দিকগুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা জরুরি।জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক সংস্থা (UNODC)-এর World Drug Report অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে মাদকের বাজার আগের চেয়ে আরও বৈচিত্র্যময় ও জটিল হয়ে উঠছে। নতুন ধরনের সিনথেটিক মাদক, অনলাইন যোগাযোগব্যবস্থা এবং সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র মাদক পাচার ও বিপণনকে আরও সহজ করেছে। একই সঙ্গে তরুণ ও কিশোরদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন কৌশলে মাদক ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে। বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানায়, কৈশোর ও তারুণ্যে মাদক গ্রহণ মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক স্থিতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি শিক্ষাজীবন ব্যাহত করে, কর্মক্ষমতা কমায় এবং বিষণ্নতা, উদ্বেগ, সহিংসতা ও আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।বাংলাদেশে মাদকের বিস্তারের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। সীমান্তপথে পাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সক্রিয়তা, বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি এবং কিছু ক্ষেত্রে সহজ অর্থ উপার্জনের লোভ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গোপন অনলাইন নেটওয়ার্কও নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। ফলে মাদক এখন আর নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চল বা শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব শহর, মফস্বল ও গ্রাম—সবখানেই বিস্তৃত।তবে সমস্যাটিকে শুধুই অপরাধ হিসেবে দেখলে সমাধান অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, যেসব দেশ প্রতিরোধমূলক শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, পরিবারভিত্তিক সচেতনতা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ওপর সমান গুরুত্ব দিয়েছে, তারা দীর্ঘমেয়াদে তুলনামূলক ভালো ফল পেয়েছে। পর্তুগালের মতো দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, আসক্ত ব্যক্তিকে শুধু শাস্তির দৃষ্টিতে নয়, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের আওতায় আনাও কার্যকর নীতির অংশ হতে পারে। তবে প্রতিটি দেশের সামাজিক ও আইনগত বাস্তবতা ভিন্ন; তাই বাংলাদেশের জন্যও নিজস্ব প্রেক্ষাপটে সমন্বিত নীতি প্রয়োজন।বাংলাদেশে এখন সময় এসেছে একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের। প্রথমত, সীমান্ত নিরাপত্তা ও মাদক পাচার প্রতিরোধে আধুনিক প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং আর্থিক অপরাধ দমনের সক্ষমতা আরও জোরদার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বয়সভিত্তিক মাদকবিরোধী শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। তৃতীয়ত, পরিবারকে সন্তানের আচরণগত পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং খোলামেলা পারিবারিক যোগাযোগের পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, খেলাধুলা, সংস্কৃতি, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে তরুণদের জন্য ইতিবাচক বিকাশের ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে আসক্ত ব্যক্তিদের জন্য বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনসেবা আরও সহজলভ্য করা প্রয়োজন।গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু মাদক উদ্ধার বা গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়; মাদকের কারণ, সামাজিক প্রভাব, প্রতিরোধের উপায়, পুনর্বাসনের সাফল্য এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে অনুসন্ধানী ও তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতাও সমানভাবে প্রয়োজন। জনসচেতনতা তৈরিতে এই ভূমিকা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হতে পারে।মাদকের সহজলভ্যতা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার ফল নয়; এটি বহুস্তরীয় একটি সামাজিক চ্যালেঞ্জ। তাই এর সমাধানও হতে হবে সমন্বিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম, কার্যকর বিচারব্যবস্থা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা, পরিবার, স্বাস্থ্যসেবা, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ—সবাইকে একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে হবে।বাংলাদেশের সামনে এখনো সুযোগ রয়েছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করার। কিন্তু সেই সুযোগ দীর্ঘদিন খোলা থাকবে না। আজকের সঠিক সিদ্ধান্ত, বৈজ্ঞানিক নীতিনির্ধারণ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের বাংলাদেশ হবে মাদকমুক্ত সম্ভাবনার দেশ, নাকি আসক্তির ভারে ন্যুব্জ একটি সমাজ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের আজই খুঁজে বের করতে হবে।তথ্যসূত্র১. United Nations Office on Drugs and Crime (UNODC), World Drug Report (সর্বশেষ সংস্করণ)।২. World Health Organization (WHO), Substance Use and Mental Health।৩. International Narcotics Control Board (INCB), Annual Report।৪. United Nations Office on Drugs and Crime (UNODC), International Standards on Drug Use Prevention।৫. মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (বাংলাদেশ) – প্রকাশিত প্রতিবেদন ও সচেতনতামূলক তথ্য। 

মাদকের সহজলভ্যতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম