উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
মাঠে ফসলের মাঠ ছোট হয়ে আসছে, শহরে চার দেয়ালের কংক্রিটের খাঁচায় আকাশটা হারিয়ে যাচ্ছে, যানবাহনের অবিরাম হর্নে কাধের ওপর চেপে বসছে এক ক্লান্তি—এই চিরচেনা বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তে আজ একটি নীরব পদশব্দ শোনা যাচ্ছে। এটি হলো মানুষের পদশব্দ। পরিসংখ্যানের খাতা খুলে বসলে দেখা যায়, একর প্রতি ইঞ্চি জমিতে মানুষের ঘনত্ব আজ এমন এক সীমায় এসে ঠেকেছে, যেখানে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত মাপা হওয়া জরুরি। প্রচলিত ধারণায় যাকে আমরা ‘জনসংখ্যা বিস্ফোরণ’ বলে অভ্যস্ত, তা কেবল অতিরিক্ত মানুষের ভিড় নয়; এটি আমাদের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, পরিবেশ এবং নাগরিক অধিকারের এক গভীর সংকট ও নতুন রূপান্তরের হাতছানি।বিশ শতকের শেষভাগে আমাদের দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির যে উচ্চহার দেখা দিয়েছিল, তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল সর্বব্যাপী। বর্তমান দশকে জন্মহার কিছুটা শ্লথ হলেও পুঞ্জীভূত জনসংখ্যার কারণে আমাদের মোট জনসংখ্যা এখন প্রায় ১৮ কোটির কোঠায়। তবে আধুনিক সমাজবিজ্ঞান ও জনমিতির দৃষ্টিতে বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল একটি ‘বিস্ফোরণ’ হিসেবে দেখা ভুল হবে। বরং এটি এক ধরনের ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক সুফলের সন্ধিক্ষণ, যেখানে তরুণ কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বিশাল জনশক্তিকে আমরা কি দক্ষ সম্পদে পরিণত করতে পারছি, নাকি তারা ক্রমেই সমাজের ওপর এক অলঙ্ঘনীয় বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে? শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও বাসস্থানের সীমিত সুযোগের সাথে পাল্লা দিয়ে মানুষের এই তীব্র স্রোত আমাদের সামগ্রিক উন্নয়নকে নানাভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।জনসংখ্যার এই অতিরিক্ত চাপ শুধু শহরের বস্তি বা ফুটপাতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ছড়িয়ে পড়েছে আমাদের জীবনযাপনের প্রতিটি স্তরে:পরিবেশগত বিপর্যয় ও অপরিকল্পিত নগরায়ন: জমির মাত্রাতিরিক্ত বিভাজন এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে জলাশয় ভরাট হয়ে যাচ্ছে, বনভূমি উজাড় হচ্ছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো মেগাসিটিগুলো আজ কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হয়ে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে।শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ভঙ্গুরতা: সরকারি হাসপাতালগুলোতে শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা বহুগুণ বেশি। অন্যদিকে, মানসম্মত শিক্ষার অভাব এবং লাখ লাখ বেকারের মেধা ও শ্রমের সঠিক মূল্যায়নের ঘাটতি সমাজকে এক অদৃশ্য হতাশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।সম্পদের অসম বণ্টন ও জলবায়ু অভিবাসন: নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে জলবায়ু উদ্বাস্তুরা প্রতিনিয়ত গ্রাম থেকে শহরে ছুটে আসছে। ফলে শহুরে অর্থনীতিতে তীব্র চাপ পড়ছে এবং অপরাধপ্রবণতা ও জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী হচ্ছে।শুধু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নয়, চাই সুষম ব্যবস্থাপনাঅতীতে জনসংখ্যা সমস্যার সমাধানে কেবল পরিবার পরিকল্পনা বা জন্মনিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেওয়া হতো। কিন্তু একুশ শতকের এই সময়ে এসে সেই পুরনো ধারণায় পরিবর্তন আনা জরুরি। শুধু সংখ্যা কমানোর কথা না ভেবে, বর্তমান মানবসম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও বিকেন্দ্রীকরণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।১. শিক্ষার মানোন্নয়ন ও কারিগরি বিপ্লবপুঁথিগত শিক্ষার পরিবর্তে যুবসমাজকে কর্মমুখী, প্রযুক্তিগত এবং কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম যেন কেবল চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেরাই উদ্যোক্তা হতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।২. বিকেন্দ্রীকরণ ও গ্রামভিত্তিক অর্থনীতিঢাকা-কেন্দ্রিক উন্নয়ন নীতি থেকে সরে এসে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। প্রতিটি গ্রামে শহরের সুযোগ-সুবিধা (ডিজিটাল সেবা, ভালো স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও মানসম্মত শিক্ষা) পৌঁছে দিতে পারলে রাজধানীমুখী অতিরিক্ত মানুষের স্রোত আপনাআপনি কমে যাবে।৩. নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণপরিবার পরিকল্পনা এবং সচেতনতার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নারীদের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলে পরিবারে সন্তান গ্রহণের হার স্বাভাবিকভাবেই জনমিতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।সংখ্যা দিয়ে একটি জাতিকে মাপা যায় না, মাপা হয় তার গুণগত মান দিয়ে। অতিরিক্ত জনসংখ্যাকে আতঙ্ক হিসেবে না দেখে, যদি সঠিক পরিকল্পনা, মেধা ও দূরদর্শিতার সাথে নীতি প্রণয়ন করা যায়, তবে এই ১৭-১৮ কোটির মানুষই হতে পারে বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগে আমাদের নীতিনির্ধারক ও সচেতন নাগরিকদের এক হয়ে কাজ করতে হবে—যাতে প্রতিটি জীবন কেবল একটি সংখ্যা হয়ে না থেকে, দেশের সম্পদে পরিণত হয়।