উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় নারীর ভূমিকা আজ দৃশ্যমান ও প্রশংসিত। পোশাক খাত থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা—সবখানেই নারীর উপস্থিতি বাড়ছে। তবে এই দৃশ্যমান স্বাবলম্বিতার নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে পারিবারিক স্তরের এক নীরব অর্থনৈতিক বৈষম্য। ধর্মীয় বিধান, সাংবিধানিক নীতি এবং দেশীয় আইন থাকা সত্ত্বেও দেশের অধিকাংশ পরিবারে কন্যাসন্তান ও নারীদের প্রাপ্য ‘হক’ বা অধিকার যথাযথভাবে পরিশোধ করা হচ্ছে না। আইনগত জটিলতার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘পারিবারিক ভালোবাসা’ ও ‘সম্পর্কের সুতা ছিঁড়ে যাওয়ার ভয়’-কে ঢাল বানিয়ে তৈরি করা এক সামাজিক সংস্কৃতি।উত্তরাধিকার: আবেগের চাপে বাপের বাড়ির সম্পত্তি ত্যাগবাংলাদেশে প্রচলিত ধর্মীয় আইন অনুযায়ী পারিবারিক সম্পত্তিতে নারীর সুনির্দিষ্ট অংশ নির্ধারিত রয়েছে। অথচ বাস্তব চিত্র ভিন্ন।অধিকাংশ পরিবারে কন্যাসন্তানদের ছোটবেলা থেকেই পরোক্ষভাবে শেখানো হয়—বাবার সম্পত্তির অংশ দাবি করা মানে ভাইদের ক্ষতি করা। ভাইদের সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা এবং বাপের বাড়িতে 'নাইওর' আসার অধিকার বাঁচিয়ে রাখার শর্ত হিসেবে নারীরা নিজেদের প্রাপ্য অংশ দাবি করা থেকে বিরত থাকেন। অনেক পরিবারেই মেয়েদের বিয়ের খরচ কিংবা উৎসবের উপহারকে উত্তরাধিকারের বিকল্প হিসেবে তুলে ধরা হয়। প্রকৃতপক্ষে, বিয়ের যৌতুক বা উপহার কখনো আইনগত উত্তরাধিকারের বিকল্প হতে পারে না।জাতিসংঘ (UN Women), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে মোট কৃষি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ১০ থেকে ১৫ শতাংশেরও কম নারীদের নামে নিবন্ধিত। অথচ ধর্মীয় আইন (যেমন মুসলিম পারিবারিক আইন) অনুযায়ী কন্যা, স্ত্রী বা মা হিসেবে নারীদের সম্পত্তির সুনির্দিষ্ট অধিকার রয়েছে। বাস্তবে এই অধিকার কাগজের কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে।কন্যাসন্তানকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে অনেক বাবা তাদের স্থাবর সম্পত্তি জীবিত থাকতেই ছেলেদের নামে দান (হেবা) বা বিক্রি দলিলের মাধ্যমে রেজিস্ট্রি করে দেন, যা নারীকে নিঃস্ব করে ফেলে।মোহরানা ও খোরপোষ: কাগজে স্বীকৃতি, বাস্তবে অনিশ্চয়তাপারিবারিক জীবনে নারীর দ্বিতীয় প্রধান অর্থসামাজিক অধিকার হলো মোহরানা এবং খোরপোষ। তবে এটিকেও সমাজে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়।বিচ্ছেদের জরিমানা হিসেবে দেখা: বিয়ের সময় ধার্যকৃত মোহরানা স্ত্রীর তাৎক্ষণিক ও স্বাধীন প্রাপ্য অধিকার। অথচ অধিকাংশ পরিবারে মোহরানাকে দেখা হয় কেবল বিচ্ছেদ ঠেকানোর একপ্রকার ‘জরিমানা’ হিসেবে। ফলে দাম্পত্য জীবন বজায় থাকাকালে সিংহভাগ নারী তাদের এই অর্থনৈতিক হক থেকে বঞ্চিত থাকেন।খোরপোষে অবমূল্যায়ন: পরিবারে নারীর গৃহস্থালি শ্রম বা 'অবৈতনিক যত্নমূলক কাজ' (Unpaid Care Work)-এর কোনো আর্থিক মূল্য হিসাব করা হয় না। আবার বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটলে কিংবা টানাপোড়েন তৈরি হলে নারীকে তার আইনগত খোরপোষ পাওয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি আইনি লড়াইয়ের মুখে পড়তে হয়।নারীর স্থাবর সম্পত্তির মালিকানা না থাকা কেবল ব্যক্তিগত বঞ্চনা নয়, এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করছে।ব্যাংক ঋণের জামানত সংকট: বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তাদের বড় একটি অংশ ব্যাংকিং খাত থেকে কাঙ্ক্ষিত ঋণ পান না। এর প্রধান কারণ, ঋণ পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় স্থাবর সম্পত্তি বা জমির দলিল (Collateral) অধিকাংশ নারীর নামে থাকে না।বার্ধক্যে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা: শেষ বয়সে স্বামী বা বাবার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত নারীরা চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক ঝুঁকিতে পড়েন, যা তাদের অন্যের দয়া বা আশ্রয়ের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে।নারীর অধিকারবঞ্চনার এই সংকট কেবল আইনি প্রয়োগের অভাব নয়, এটি মূলত সামাজিক মানসিকতার এক গভীর ব্যাধি। এটি দূর করতে হলে উত্তরাধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে নামজারি (মিউটেশন) হওয়ার ডিজিটাল আইনি কাঠামো জোরদার করা, মোহরানা আদায়ের সংস্কৃতি পরিবর্তন করা এবং ‘মেয়েরা পাওনা চাইলে পর হয়ে যায়’—এই সামাজিক ধারণা ভাঙা জরুরি। পরিবার থেকেই নারীর প্রাপ্য মিটিয়ে দেওয়া কোনো দয়া বা দান নয়, এটি তার মৌলিক ও আইনগত স্বাধিকার।