উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
বিশ্বকাপ ফুটবলের মেগা ফাইনাল অনুষ্ঠিত হতে চলেছে নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে, যেখানে মুখোমুখি হবে গতবারের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন। রবিবার দিন শেষে রাত একটায় শুরু হতে যাওয়া এই ম্যাচটি হতে যাচ্ছে সেরা আক্রমণ বনাম সেরা রক্ষণভাগের এক দুর্দান্ত লড়াই। এটি আবেগ, তারুণ্য এবং অভিজ্ঞতার এক চরম সংঘাতের মঞ্চ।
আর্জেন্টিনা এই টুর্নামেন্টে সাত ম্যাচে সর্বোচ্চ ১৯টি গোল করে তাদের শক্তিশালী আক্রমণভাগের প্রমাণ দিয়েছে। লিওনেল স্কালোনির অধীনে ৪-৩-৩ ছকে মেসিকে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় রেখে খেলা দলটি একজোট হয়ে খেলে। মেসি নিজে আট গোল ও চারটি গোলে সহায়তা করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং বিশ্বকাপের ইতিহাসে মোট ২১ গোল করে শীর্ষে।
আর্জেন্টিনার মাঝমাঠে লিয়ান্দ্রো পারেদেস, আলেক্সিস মাক এলিস্টার, এনজো ফের্নান্দেজ ও রদ্রিগো দে পাউল খেলা তৈরি করেন এবং প্রয়োজনে উইংয়েও সরে যান। হুলিয়ান আলভারেজের তীব্র রক্ষণাত্মক প্রেসিং ক্ষমতা তাকে শুরুর একাদশে জায়গা ধরে রাখতে সাহায্য করেছে, যা স্পেনের গভীর থেকে বল বাড়ানোর ধরন ভাঙতে জরুরি। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দলটি বক্সের বাইরে থেকে দৃষ্টিনন্দন শট, হেডে বা অবিশ্বাস্য পাসে প্রয়োজনীয় গোল বের করে আনে।
অন্যদিকে, স্পেন তুলনামূলকভাবে কম নাটকীয়তায় ফাইনালে উঠেছে এবং সাত ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করেছে। টুর্নামেন্টজুড়ে টানা ৩৭ ম্যাচে অপরাজিত থাকা স্পেন দলের এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, দলটির রক্ষণভাগ নিঃসন্দেহে সেরা। সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারানো স্পেন, পর্তুগাল ও বেলজিয়ামকে শেষ মুহূর্তের গোলে পরাজিত করে নিজেদের আধিপত্য দেখিয়েছে।
লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে স্পেনও ৪-৩-৩ ছকে খেলে, যেখানে রদ্রি, ফাবিয়ান রুইজ ও দানি ওলমো মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করেন। মিকেল ওইয়ারসাবাল, লামিন ইয়ামাল ও আলেক্স বেইনা আক্রমণ ও রক্ষণাত্মক উভয় কাজই করেন। আইমেরিক লাপোর্তে ও পাউ কুবারসির নেতৃত্বে স্পেনের প্রতিষ্ঠিত রক্ষণ কাঠামো একটি দক্ষ যন্ত্রের মতো কাজ করে এবং বল দখলে রেখে প্রতিপক্ষকে ধৈর্য হারাতে বাধ্য করাই তাদের মূল কৌশল।
উভয় দলেরই প্রধান শক্তি মাঝমাঠ দখল করে খেলা। এখন পর্যন্ত খেলাগুলোতে উভয় দলই গড়ে ৬০ ভাগ করে বলের দখল রেখেছে এবং নিজেদের মধ্যে সর্বাধিক পাস দিয়েছে (আর্জেন্টিনা ৪৭৭২, স্পেন ৪৫৯২)। স্পেন দলের প্রতিটি খেলোয়াড় পরস্পরের খেলা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল এবং তাদের গোলগুলোর বেশিরভাগই দলীয় আক্রমণের ফল, যা নিখুঁত ফুটবল বিজ্ঞানের চর্চা বলে মনে হয়।
আর্জেন্টিনা-স্পেন দ্বৈরথের ইতিহাস সমানে সমান; ১৪ বারের মুখোমুখি সাক্ষাতে উভয় দলই ৬টি করে ম্যাচ জিতেছে। বিশ্বকাপের মঞ্চে এটি তাদের প্রথম নকআউট পর্বের সাক্ষাৎ। এটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বর্তমান ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন দলের ফাইনাল এবং ৯৬ বছর পর একই ভাষাভাষী দুটি দেশের ফাইনাল (১৯৩০ সালের উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনার পর)।
এই ফাইনালটি তারুণ্য বনাম অভিজ্ঞতার এক লড়াই। আর্জেন্টিনা দলের গড় বয়স ২৮.৬২ বছর, যা ৪৮টি দলের মধ্যে ৪০তম। অন্যদিকে, স্পেনের গড় বয়স ২৬.১৯ বছর, যা ষষ্ঠ। ৩৯ বছর বয়সী মেসি এবং ১৯ বছর বয়সী লামিন ইয়ামাল যেন একই সাথে দুই দলের প্রতীক — মেসি অভিজ্ঞতা ও আবেগের, ইয়ামাল তারুণ্য ও সম্ভাবনার।
উভয় দলই এই টুর্নামেন্টে অপরাজিত থেকে ফাইনালে উঠেছে। আর্জেন্টিনা নকআউট ম্যাচগুলোতে ফিরে আসার দারুণ গল্প লিখেছে। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও ২-১ গোলে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে এবং শেষ ষোলোতে মিশরের বিপক্ষে ০-২ গোলে পিছিয়ে থেকেও ৩-২ গোলে ফিরে আসার মতো নাটকীয়তা দেখিয়েছে। শেষ ১৫ মিনিটে একাধিক গোল দিয়ে আর্জেন্টিনা তাদের দৃঢ় মানসিকতা ও জয়ের তীব্র ইচ্ছা প্রমাণ করেছে।
৯৬ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপের (৪৮ দল, ১০৪টি ম্যাচ) ফাইনাল ঘিরে থাকছে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। ফাইনালের ৯০ মিনিট আগে সমাপনী অনুষ্ঠান, যেখানে পোস্ট ম্যালোন, টম ক্রুজসহ অনেক তারকা পারফর্ম করবেন। জেনিফার হাডসন মার্কিন জাতীয় সংগীত গাইবেন এবং বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো হাফটাইম শোতে ম্যাডোনা, শাকিরা, বিটিএস ও জাস্টিন বিবার থাকবেন।
আর্জেন্টিনা জিতলে ১৯৭৮, ১৯৮৬, ২০২২ সালের পর চতুর্থবারের মতো শিরোপা জিতে জার্মানি ও ইতালির সাথে স্থান করে নেবে এবং টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব অর্জন করবে। অন্যদিকে, ২০১০ সালের চ্যাম্পিয়ন স্পেন জিতলে এটি হবে তাদের ইতিহাসে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয় এবং ফাইনাল গেলে শতভাগ জয়ী হওয়ার রেকর্ড অক্ষুণ্ন রাখবে।