উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডের বৃহত্তম শহর ব্রিস্টলে নির্মিত হচ্ছে ‘সেন্ট জেমস হাউস’ নামের এক নতুন প্রকল্প। এই প্রকল্পের ২৮ তলা ভবনটি শিক্ষার্থীদের জন্য এবং ১৮ তলার আরেকটি ব্লক তরুণ পেশাজীবীদের জন্য তৈরি হচ্ছে। এটি ব্রিস্টলের সবচেয়ে উঁচু ভবন হিসেবে পরিচিতি পাবে।
শিক্ষার্থীদের আবাসন খাতে বিনিয়োগ কেইন ও মেনোরা মিভতাচিমের মতো বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল আয়ের উৎস। ব্রিস্টলে গত এক দশকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়লেও, আবাসনের সরবরাহ সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে এটি দেশের অন্যতম বড় আবাসন সংকটের শহরে পরিণত হয়েছে।
সেন্ট জেমস হাউসের নির্মাণ সাইটের উলটো দিকে গোলচত্বরের কংক্রিটের প্লাজায় প্রায়ই মানুষকে তাঁবু টানিয়ে ঘুমাতে দেখা যায়। ব্রিস্টলজুড়ে পার্ক এবং সবুজ জায়গাগুলোতেও এমন তাঁবুর দেখা মেলে। এমনকি রাস্তার পাশে গাড়িতে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা এতটাই বেড়েছে যে, সিটি কাউন্সিল তাদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।
এই প্রকল্পে বিনিয়োগকারী কেইন এবং মেনোরা মিভতাচিম—উভয় প্রতিষ্ঠানের জন্যই শিক্ষার্থীদের আবাসন খাতে বিনিয়োগ তাদের সাধারণ ব্যবসার ধরন থেকে কিছুটা আলাদা। ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে কেইন বিশ্বের প্রধান শহরগুলোতে উচ্চমানের রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগের দিকে মনোনিবেশ করেছে এবং বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ পরিচালনা করে। অন্যদিকে, তেল আবিব-ভিত্তিক মেনোরা মিভতাচিম ইসরাইলের অন্যতম বৃহৎ ও পুরোনো বীমা এবং আর্থিক সেবা গোষ্ঠী।
গবেষণা কেন্দ্র হু প্রফিটস-এর মতে, মেনোরা মিভতাচিম সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব চুক্তির মাধ্যমে নেগেভ মরুভূমিতে ইসরাইলি সামরিক অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। এসব প্রকল্পের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার স্থায়ী সামরিক কর্মীর জন্য নির্মিত বিশাল ‘সিটি অব ট্রেনিং বেস’ এবং ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা ইউনিটগুলোর জন্য তৈরি ‘কুরিয়াত হামোদিউইন’ অন্যতম।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে মেনোরা মিভতাচিম প্রথমবারের মতো কেইন-এর দ্রুত সম্প্রসারিত ব্রিটিশ স্টুডেন্ট টাওয়ার পরিকল্পনায় সরাসরি বিনিয়োগ করে। ৫০ কোটি পাউন্ডের (৬৭০ মিলিয়ন ডলার) লেনদেনের মাধ্যমে এই বিনিয়োগ করা হয়। ২০২৪ সালে ব্রিস্টলের সেন্ট জেমস হাউসসহ আরও কিছু অধিগ্রহণের পর, বছরের শেষে মেনোরা অতিরিক্ত মূলধন বিনিয়োগ করে, যা এই পোর্টফোলিওর মোট উন্নয়ন মূল্যকে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি করতে সাহায্য করে।
কেইন-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও জোনাথন গোল্ডস্টেইন ইসরাইলপন্থি ‘জিউইশ লিডারশিপ কাউন্সিল’-এর প্রাক্তন সভাপতি। তিনি লেবার পার্টির প্রাক্তন নেতা জেরেমি করবিনের বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবেলায় ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে প্রচারণায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। গোল্ডস্টেইন রিয়েল এস্টেট ম্যাগনেট জেরাল্ড রনসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন, যিনি দীর্ঘকাল ধরে ইসরাইলের সমর্থক।
গোল্ডস্টেইন সম্প্রতি দ্য টাইমস-এর এক সাক্ষাৎকারে পদত্যাগী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের একজন সমর্থক এবং বন্ধু হিসেবে উল্লেখ হয়েছেন। ২০১৫ সালে লন্ডনের মেয়র প্রার্থী হওয়ার জন্য ডেভিড ল্যামির প্রচারাভিযানে গোল্ডস্টেইন অর্থ দান করেছিলেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গোল্ডস্টেইন বলেছিলেন, ইসরাইল এই নৃশংসতার জবাবে যা উপযুক্ত মনে করবে, তাতে তাদের পূর্ণ সমর্থন দেওয়া উচিত।
ব্রিস্টল একসময় ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় শহর হিসেবে পরিচিত ছিল, যা তামাক, চিনি এবং আটলান্টিক পাড়ি দেওয়া দাস ব্যবসার মাধ্যমে ধনী হয়ে উঠেছিল। একই সময়ে এটি ব্রিটিশ এস্টাবলিশমেন্টকে চ্যালেঞ্জকারী রাজনৈতিক ভিন্নমতের কেন্দ্র হিসেবেও বিকশিত হতে শুরু করে।
ফিলিস্তিন সংহতি আন্দোলনের জন্য ব্রিস্টল দেশের অন্যতম সক্রিয় কেন্দ্র, যেখানে নিয়মিত শহরের কেন্দ্রস্থলে পদযাত্রা, সমাবেশ, তহবিল সংগ্রহ এবং বয়কট প্রচারণার মতো কর্মসূচি দেখা যায়। ২০২৪ সালের যুক্তরাজ্যের নির্বাচনে ব্রিস্টল সেন্ট্রাল নির্বাচনি এলাকা গ্রিন পার্টির কার্লা ডেনিয়ারকে নির্বাচিত করেছে, মূলত গাজায় চলমান ধ্বংসযজ্ঞে লেবার পার্টির নীরব সমর্থনের প্রতি ক্ষোভ থেকেই এই জয় আসে।
এটি এক চরম পরিহাসের বিষয় যে, ব্রিস্টলের সবচেয়ে উঁচু ভবনটি সরাসরি শহরটিকে এমন একটি আর্থিক ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করবে, যা ইসরাইলের গণহত্যাকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে। উপসাগরীয় পুঁজি, ইসরাইল এবং কুশনার পরিবার এই নেটওয়ার্কগুলোর অংশ।
কেইন এবং মেনোরা মিভতাচিম এই বৃহত্তর জালেরই অংশ। ২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত হিসেবে জ্যারেড কুশনারের প্রথম আনুষ্ঠানিক ইসরাইল সফরের ঠিক আগে, কুশনার কোম্পানিজ মেনোরা মিভতাচিমের কাছ থেকে ৩ কোটি ডলারের বিনিয়োগ পেয়েছিল।
জ্যারেড কুশনারের বাবা চার্লস কুশনারের সঙ্গে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর এতটাই ঘনিষ্ঠতা ছিল যে, উঠতি লিকুদ নেতা নেতানিয়াহু যখন যুক্তরাষ্ট্রে যেতেন, তখন তিনি কুশনার পরিবারের বাড়িতে থাকতেন। এই বছরের শুরুতে কেইন কুশনার কোম্পানিজের সঙ্গে একটি যৌথ উদ্যোগের ঘোষণা দেয়। জ্যারেড কুশনারের নেতৃত্বে হওয়া আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ইসরাইল, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং পশ্চিমা বাজারগুলোর মধ্যে বিনিয়োগের পথ সুগম হয়েছে।
কেইন মূলত উপসাগরীয় সার্বভৌম পুঁজির এই ইকোসিস্টেমেই কাজ করে। ২০২২ সালে সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড জ্যারেড কুশনারের প্রতিষ্ঠিত প্রাইভেট-ইকুইটি ফার্ম ‘অ্যাফিনিটি পার্টনার্স’-এ ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে। একই বছরে কেইন আমান গ্রুপে সৌদি আরবের পিআইএফ-এর সঙ্গে যৌথভাবে ৯০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।