উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
চলতি বিশ্বকাপ মৌসুমে স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাহয়-এর "ফ্রান্সের দলে তো ফরাসিই নেই" মন্তব্য বিশ্বজুড়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। স্পেনের অনলাইন সংবাদপত্র এল ডিবেট-এ প্রকাশিত তার এই উক্তি বর্ণবিদ্বেষ, অভিবাসন এবং নাগরিকত্বের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলি নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েছে। সেমিফাইনাল ম্যাচে ফ্রান্সের কাছে স্পেনের হারের আগেই এই মন্তব্য করেন রাহয়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছেন স্পেনের অতি বামপন্থী সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টির শীর্ষ নেতা পেদ্রো স্যাঞ্চেজ। তিনি এটিকে "জেনোফোবিক" বা ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ বলে অভিহিত করেন। ফ্রান্সের বামপন্থী দলগুলির নেতারাও এই মন্তব্যের বিরোধিতায় সরব হয়েছেন।
ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোস ম্যানুয়েল আলবারেস দেশের হয়ে ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, মারিয়ানো রাহয়ের মন্তব্য "গ্রহণযোগ্য নয় এবং সিংহভাগ স্পেনিয়ার্ডদের রাষ্ট্রীয় অনুভূতির বিরোধী"। ফ্রেঞ্চ সোশ্যালিস্ট পার্টির নেতা অলিভিয়ার ফউরেও সামাজিকমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, "ফ্রান্স একটি নির্দিষ্ট ধরনের মানুষের রাষ্ট্র নয়। ফ্রান্স রাষ্ট্রের কোনও বর্ণ ও ধর্ম নেই।" ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লঁর নুনেসও এই মন্তব্যকে "গ্রহণযোগ্য নয়" বলে আখ্যা দিয়ে ফ্রান্সের বৈচিত্র্যের উপর জোর দিয়েছেন।
ফুটবলকে ঘিরে এই ধরনের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। চলতি মৌসুমেই প্যারাগুয়ের সেনেটর সেলেস্তে আমারিলা ফরাসি দলের খেলোয়াড় এমবাপ্পে-কে "ঔপনিবেশিকতার শিকার এক ক্যামেরুনীয়" বলে মন্তব্য করেছিলেন, যিনি নিজেকে ফরাসি বলে জাহির করতে চান। এর জবাবে এমবাপ্পে সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, "মাদাম সেলেস্তে আমারিলা, আপনি একজন ঘৃণ্য নারী এবং আপনার পদের জন্য সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত।" তিনি আরও বলেন, তার দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও নির্লজ্জ বর্ণবিদ্বেষের জেরে প্যারাগুয়ের ঐতিহাসিক যাত্রা ও প্রচেষ্টা বিশ্ববাসীর কাছে ঢাকা পড়ে গেছে।
ফুটবলপ্রেমীরাও এই বিতর্ককে সমর্থন করছেন না। কলকাতার প্রবাসী বাঙালি সৌরকিরণ পল, যিনি টেক্সাসের হিউস্টনে জার্মানিকে সমর্থন জানাতে গিয়েছিলেন, বিবিসি বাংলাকে বলেন, "ফ্যানদের কাছে খেলোয়াড়দের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের থেকে জার্সি বড়।" কলকাতার অপর এক ফুটবল ফ্যান সম্বরণ কুমার পাল জানান, "আমরা যখন খেলা দেখি তখন একটা টিমের খেলা দেখি," এবং তিনি স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যকে সমর্থন করতে পারেন না।
বামপন্থী ভাবধারার প্রবাসী সাংবাদিক অর্ক ভাদুড়ি এই মন্তব্যকে ভারতের 'ঘুসপেটিয়া' বা 'অনুপ্রবেশকারী' বলে কিছু মানুষকে দেগে দেওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি পেদ্রো স্যাঞ্চেজের বক্তব্যকে সমর্থন করে বলেছেন, "দেশ তাদেরই, যারা দেশকে ভালোবসেন। দেশ ঘৃণাজীবীদের নয়।"
সাম্প্রতিককালে ইউরোপে বর্ণ বনাম রাষ্ট্রীয় অবদান—এই দুইয়ের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব নির্ধারণ নিয়ে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বিভাজন দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাজ্য ও ইতালি-সহ কয়েকটি দেশে শরণার্থী বিরোধী আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে, যা বহু ডানপন্থী নেতা সমর্থন করেন। অন্যদিকে, একদল মনে করেন, একজন মানুষ রাষ্ট্রের জন্য অবদান রাখলে, তিনি যে বর্ণ-সংস্কৃতিরই হন না কেন, তিনি সেই দেশেরই নাগরিক ও প্রতিনিধিত্বকারী।
দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইউরোপিয়ান স্টাডিজ-এর অধ্যাপক ড. গুলশন সচদেভা মনে করেন, ইউরোপে অভিবাসী বিরোধী মনোভাব ক্রমেই মাথাচাড়া দিচ্ছে, ফলে উদারপন্থী ও দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলি সরাসরি সংঘর্ষে জড়িত।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ঔপনিবেশিক যুগের পর ইউরোপীয় দেশগুলো 'মাল্টিকালচারালিজম' বা বিভিন্ন বর্ণের মানুষের সহাবস্থানের দিকে ঝুঁকলেও সেই মডেল খুব বেশি সফল হয়নি। ড. সচদেভা বলেন, ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যা বলেছেন সেটি 'পলিটিক্যালি কারেক্ট' হলেও, সেখানে পরস্পরবিরোধী আভাস রয়েছে, যা জাতীয় গৌরবের ক্ষেত্রে অভিবাসী বংশোদ্ভূতদের অবদানকেই বিচার করার ইঙ্গিত দেয়।