উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে শুল্ক আরোপের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পিছু হটা ইঙ্গিত দেয় যে, তিনি ইরান যুদ্ধ শেষ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। চার মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাতের ইতি টানতে তিনি রীতিমতো কৌশল খুঁজছেন।
মাসখানেক আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল, যা একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং শান্তি আলোচনার পথ খুলেছিল। তবে দফায় দফায় আলোচনা সত্ত্বেও যুদ্ধ অবসানের কোনো লক্ষণ এখনও দেখা যাচ্ছে না।
উল্টো দু'পক্ষের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে, যা জ্বালানির বাজারকে আবারও অস্থিতিশীল করে তোলার আশঙ্কা তৈরি করছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও তাদের মিত্র দেশগুলোতে ইরানি হামলার ঝুঁকিও বেড়েছে।
মি. ট্রাম্প যুদ্ধটিকে আরও তীব্রতর করতে চাচ্ছেন না এবং এই সংকট থেকে বের হতে অপ্রচলিত উপায় খুঁজছেন বলে মনে হচ্ছে। তিনি সম্ভবত ২০১৫ সালে বারাক ওবামার প্রশাসনের করা চুক্তির চেয়ে 'ভালো কিছু' দাবি করতে চান।
তবে এভাবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাঙ্ক ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক রোজমেরি কেলানিদ বলেন, "আমার মনে হয়, এর সম্ভাব্য পরিণতি হলো কোনো সমাপ্তি না হওয়া।"
তিনি আরও যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধটি একটি "ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে" পরিণত হয়েছে, যা সাধারণত দীর্ঘ ও লম্বা সময় ধরে চলতে থাকে। সম্প্রতি সই হওয়া সমঝোতা স্মারকটিও যুদ্ধ শেষের আশা জাগাতে পারেনি।
মঙ্গলবার সকালে ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে মি. ট্রাম্প ইরানের জাহাজ চলাচলের ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেন। জবাবে ইরানিরা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্র ও তাদের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বাড়িয়ে দেয়।
এমন পাল্টা-পাল্টি পদক্ষেপে হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল আবারও প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। মাসখানেক ধরে বারবার চালু ও স্থগিত হওয়া শান্তি আলোচনার মধ্যে দেশ দু'টির সংঘাত 'যুদ্ধবিরতি'র সংজ্ঞাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সামরিকভাবে আমেরিকানরা ইরানি জাহাজ, বিমান ও স্থাপনা ধ্বংস করে সফলতা পেলেও রাজনৈতিকভাবে সংঘাত নিরসনে তারা এখনও অনেক দূরে। সামরিকভাবে দুর্বল করা হলেও ইরান হরমুজ প্রণালিতে আধিপত্য বজায় রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের সামরিক অভিযান ব্যাপকভাবে না বাড়ায়, তবে তারা ইরানিদের দমাতে সক্ষম হবে না। একদিন আগে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে যে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কৌশলের কথা বলেছিলেন, তা সম্ভবত নিজ দেশের জনগণের কাছে সামরিক তৎপরতাকে গ্রহণযোগ্য করার একটি উপায় ছিল।
এই প্রস্তাবটি নতুন ছিল না; ট্রাম্প নিজেই যুদ্ধ শুরুর পর এমন একটি ব্যবস্থার কথা বেশ কয়েকবার বলেছেন। তবে গত জুনে যখন ইরানের দিক থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে শুল্ক দেওয়ার পরিকল্পনা এসেছিল, তখন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এর নিন্দা জানিয়েছিলেন।
রুবিও বলেছিলেন, "কোনো দেশই আন্তর্জাতিক জলপথে শুল্ক বা মাশুল আদায় করতে পারে না। এটাই বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আইন।" ট্রাম্প শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত জানিয়ে সেখান থেকে আবার সরে আসলেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এর মধ্য দিয়ে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, যুদ্ধ শেষ করার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা নেই। এ অবস্থায় ট্রাম্পকে দুটি বিকল্পের মধ্যে একটি বেছে নিতে হবে।
একটি হলো সামরিক তৎপরতা বাড়িয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ করা, যার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে। দ্বিতীয় বিকল্পটি হলো এমন কোনো সমাধানে রাজি হওয়া, যা যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে 'একটি বৈরী ইরানি শাসনব্যবস্থাকে' ক্ষমতায় রেখে দেবে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সিনিয়র ফেলো এলিয়ট আব্রামস বলেন, "আমরা আবারও সেই আগের অবস্থানেই ফিরে এসেছি, যেখানে প্রশ্ন ছিল: কার ধৈর্য বেশি?"
তিনি প্রশ্ন তোলেন, "ইরানিদের- যারা তেল রপ্তানি করতে পারবে না, নাকি যুক্তরাষ্ট্র ও পারস্য উপসাগরের তেল ব্যবহারকারী অন্যান্য দেশগুলোর?"
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিন আগে হরমুজ প্রণালিতে সব ধরনের পণ্যবাহী জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের যে সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন, সেটি তিনি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
গত সোমবার সকালে ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ পুনরায় চালুর ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সকল প্রকার জাহাজকে নিরাপত্তা ও সুরক্ষা প্রদানের জন্য ব্যয় হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে ২০ শতাংশ হারে শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। এই সিদ্ধান্ত মিত্রদের জাহাজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল।
কিন্তু পরের দিনই ট্রাম্প এই সিদ্ধান্ত থেকে পুরোপুরি সরে এসেছেন। এর পরিবর্তে তিনি আমেরিকার উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্রদের সাথে 'বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি' করার প্রস্তাব দিয়েছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যারা এই চুক্তি স্বাক্ষর করবে, যুক্তরাষ্ট্র বিনিময়ে তাদেরকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে যাতায়াতের সুযোগ করে দিবে।