উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন, যিনি সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক উপদেষ্টা, বন্যা ও জলাবদ্ধতার সময় মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিকে দুটি প্রধান ভাগে ব্যাখ্যা করেছেন। এই সময়ে বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে।
প্রথমত, বিশুদ্ধ পানি, নিরাপদ খাবার ও স্যানিটেশনের তীব্র সংকট তৈরি হয়। চারপাশে পানি থাকলেও তা প্রায়শই পান করার অযোগ্য থাকে, ফলে খাবার ও পানির উৎস দূষিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, এটি বন্যার সময় সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর একটি।
নিরাপদ পানি ও খাবারের অভাবে দ্রুত ডায়রিয়া, কলেরাসহ বিভিন্ন পানিবাহিত ও খাবারবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ে। ডায়রিয়া মূলত দূষিত পানি বা পঁচা খাবার থেকে হয়, যার ফলে শরীর থেকে দ্রুত পানি ও ইলেক্ট্রোলাইট বেরিয়ে গিয়ে দুর্বলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে শিশুরা এতে বেশি আক্রান্ত হয়।
কলেরা একটি সংক্রামক ডায়রিয়াজনিত রোগ, যা দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে ছড়ায় এবং একটি বিশেষ ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। এর প্রধান লক্ষণ তীব্র ডায়রিয়া, বমি, পানির তৃষ্ণা বৃদ্ধি, দ্রুত ক্লান্তি এবং হার্টবিট বেড়ে যাওয়া। জটিল অবস্থায় কিডনি ফেইলিউর বা শকে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।
ডা. মুশতাক হোসেন জানান, কলেরা ও ডায়রিয়া ভিন্ন ভাইরাসের কারণে হলেও লক্ষণ প্রায় একই, এবং উভয় ক্ষেত্রেই পানিশূন্যতা ঠেকানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য রোগীকে দ্রুত ওরস্যালাইন, পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি পান করানো এবং গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে হাসপাতালে নেওয়া জরুরি।
দ্বিতীয় ধরনের ঝুঁকি আসে বন্যা বা জলাবদ্ধতাজনিত দুর্ঘটনা ও পরিবেশগত কারণে। এ সময় শিশুদের পানিতে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং আশ্রয়স্থল ডুবে যাওয়ায় সাপ লোকালয়ে চলে আসায় সাপের কামড়ের ঘটনাও বৃদ্ধি পায়।
জলাবদ্ধতার পানিতে হাঁটার সময় কাচ, টিন বা ধারালো বস্তুর আঘাতে পায়ে ক্ষত হতে পারে, যা দ্রুত চিকিৎসা না করা হলে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। টিটেনাসের টিকা না নেওয়া থাকলে ধনুষ্টংকারের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
বন্যা বা জলাবদ্ধতার কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পর কিছু রোগ প্রকাশ পেতে পারে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য টাইফয়েড। এটি পানি ও খাদ্যবাহিত একটি রোগ, যার প্রধান লক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, মাথাব্যথা, দুর্বলতা ও পেটব্যথা। সময়মতো চিকিৎসা না হলে মস্তিষ্কে প্রদাহ, অন্ত্র ছিদ্র বা রক্তক্ষরণ হয়ে শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রতি বছর প্রায় ৪.৭৮ লাখ মানুষ টাইফয়েডে আক্রান্ত হয় এবং ৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়, যাদের ৬৮ শতাংশই শিশু।
টানা বৃষ্টিপাতের কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় হেপাটাইটিস এ ও ই (জন্ডিস) রোগের প্রকোপও বাড়ে। যদিও এই দুটি হেপাটাইটিস বি বা সি এর মতো মারাত্মক নয়, তবে গর্ভবতী মায়েদের জন্য হেপাটাইটিস ই বেশ ক্ষতিকর হতে পারে। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে খাওয়ায় অরুচি, বমি, চোখ ও গায়ের রঙ হলুদ হওয়া এবং প্রস্রাব অতিরিক্ত হলুদ হওয়া।
জলাবদ্ধতা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বসবাসের কারণে চর্মরোগের ঝুঁকিও তৈরি হয়, বিশেষ করে আশ্রয়কেন্দ্রে গাদাগাদি করে থাকার ফলে। স্ক্যাবিস একটি পরজীবী চর্মরোগ যা সরাসরি সংস্পর্শ বা ব্যবহৃত জিনিসপত্রের মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় না রাখলে এই রোগ কিডনি সমস্যাসহ অন্যান্য জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
আশ্রয়কেন্দ্রে দীর্ঘ অবস্থানের কারণে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, নিউমোনিয়া ও হাঁপানি বাড়তে পারে। এছাড়া, নিরাপদ টয়লেটের অভাব ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে নারী-পুরুষ উভয়েই ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (ইউটিআই) বা মূত্রতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত হতে পারেন, যা নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। বন্যা পরিস্থিতিতে পশু-পাখির সংস্পর্শে অ্যানথ্রাক্স এবং ইঁদুরের প্রস্রাবে দূষিত পানির মাধ্যমে লেপ্টোস্পাইরোসিস সংক্রমণের ঝুঁকিও থাকে।
ডেঙ্গু নিয়ে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে বন্যার সময় এর ঝুঁকি বাড়ে। ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, বর্ষায় এডিস মশা বাড়ে না; বরং বন্যার পানি এডিস মশার ডিম ও লার্ভা ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তবে পানি নেমে যাওয়ার পর পরিষ্কার পানি জমে থাকলে সেখানে এডিস মশা বংশবিস্তার শুরু করতে পারে।
বন্যা বা জলাবদ্ধতার সময় শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা হাঁপানির মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। জ্বর, পেশিব্যথা, ডায়রিয়া বা অন্য কোনো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন। নিরাপদ পানির ব্যবহার এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এই রোগ প্রতিরোধের একমাত্র উপায়। গর্ভবতী মায়েদের জন্য নিরাপদ প্রসব ও নবজাতককে বুকের দুধ খাওয়ানোর নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।