উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
সাতক্ষীরার শ্যামনগরে ২০২৬ সালের শারদীয় দুর্গাপূজায় নিরাপত্তার দায়িত্ব বণ্টনকে কেন্দ্র করে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের মধ্যে এবার সামনে এসেছে আরও দুটি গুরুতর অভিযোগ। একটি হলো—আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তার বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করা এক নারী ভুয়া সনদের মাধ্যমে নিরাপত্তার ডিউটি পেয়েছেন বলে অভিযোগ। অন্যটি হলো—ডিউটির জন্য নির্বাচিত ছেলের পরিবর্তে তাঁর বাবা পরিচয় গোপন করে পূজামণ্ডপে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন শ্যামনগর উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা তাহমিনা খাতুন এবং কার্যালয়ের সহকারী ট্রেইনার ইনস্ট্রাক্টর (টিআই) আলমগীর হোসেন। এর আগে পূজার ডিউটি পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে সদস্যদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের অভিযোগও তাঁদের বিরুদ্ধে উঠেছিল। গৃহকর্মী থেকে পূজার নিরাপত্তার দায়িত্ব, সনদ নিয়ে প্রশ্ন:সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শারদীয় দুর্গাপূজায় শ্যামনগর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের ৭০টি পূজামণ্ডপে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের জন্য ৪৫০ জন আনসার সদস্য নির্বাচন করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচিত সদস্যদের তালিকায় রয়েছেন বুড়িগোয়ালিনী এলাকার বাসিন্দা ভূপতি মণ্ডলের স্ত্রী রানী মণ্ডল।স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগকারীদের দাবি, রানী মণ্ডল উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা তাহমিনা খাতুনের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করেন। এই পরিচয়ের সুবাদে তিনি বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ সনদ না থাকা সত্ত্বেও অর্থের বিনিময়ে সনদ তৈরি বা ব্যবহার করে অনলাইনে আবেদন করে তিনি পূজার নিরাপত্তার ডিউটি পেয়েছেন।তবে রানী মণ্ডলের প্রশিক্ষণ সনদ জাল কি না, তাঁর নামে কোনো বৈধ প্রশিক্ষণ রেকর্ড রয়েছে কি না এবং নিয়োগের সময় কী কী কাগজপত্র যাচাই করা হয়েছিল—এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতার শর্ত পূরণ না করে কেউ যদি নিরাপত্তার দায়িত্ব পেয়ে থাকেন, তাহলে যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল? অনলাইনে আবেদন থেকে চূড়ান্ত নির্বাচন পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। এদিকে, পূজামণ্ডপে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনে পরিচয় পরিবর্তন করে অন্য ব্যক্তিকে পাঠানোর অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, রমজাননগর ইউনিয়নের সোনাখালী গ্রামের বিক্রম সরদার পূজার নিরাপত্তার ডিউটির জন্য নির্বাচিত হন। তাঁর দায়িত্বপ্রাপ্ত পূজামণ্ডপ ছিল ভৈরবনগর সার্বজনীন দুর্গাপূজা মন্দির।কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, বিক্রম সরদার নিজে দায়িত্ব পালন না করে তাঁর বাবা বিনাই সরদারকে সেখানে পাঠান। বিনাই সরদার ছেলের পরিবর্তে দায়িত্ব পালন করছিলেন কি না, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দেয়।অভিযোগের ভিত্তিতে ১৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বিকেল ৩টার দিকে সাতক্ষীরা জেলা আনসার ও ভিডিপি কার্যালয়ের মনিটরিং-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সামাউন কবির ভৈরবনগর সার্বজনীন দুর্গাপূজা মন্দিরে উপস্থিত হন বলে জানা গেছে।সংশ্লিষ্ট বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি সেখানে বিনাই সরদারের কাছে দায়িত্বপ্রাপ্তির সিসি বা সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব বরাদ্দের কাগজ দেখতে চান। এ সময় বিনাই সরদার নিজের নামে দায়িত্ব বরাদ্দের কাগজ দেখাতে পারেননি এবং তাঁর ছেলে বিক্রম সরদার ডিউটি পেয়েছেন বলে জানান। এরপর ঘটনাটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয় বলে জানা গেছে।এ বিষয়ে সামাউন কবিরের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, নিরাপত্তার ডিউটিতে ‘বডি চেঞ্জের’ কোনো সুযোগ নেই। তিনি জানান, ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। দুর্গাপূজার মতো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের পরিচয়, প্রশিক্ষণ এবং দায়িত্ব বণ্টনের স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তার দায়িত্ব বণ্টনে প্রশিক্ষিত ও যোগ্য সদস্যদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। প্রথম পর্বের অভিযোগের সঙ্গে নতুন ঘটনার যোগসূত্র কোথায়?এর আগে প্রকাশিত প্রথম পর্বের প্রতিবেদনে শ্যামনগরে দুর্গাপূজার নিরাপত্তার ডিউটি পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছিল।অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, জনপ্রতি ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি বা আদায়ের ঘটনা ঘটেছে। রমজাননগর ইউনিয়নের দলপতি মো. রুহুল আমিনের অভিযোগ ছিল, ৩৪ জন সদস্যের কাছ থেকে মোট ২৬ হাজার ৯০০ টাকা সংগ্রহ করে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে পৌঁছে দেন। তাঁর দাবি, উপজেলা কর্মকর্তা তাহমিনা খাতুনের সঙ্গে যোগাযোগের পর তাঁকে টিআই আলমগীর হোসেনের কাছে টাকা জমা দিতে বলা হয়েছিল।এ ছাড়া শেখ মনিরুল ইসলামসহ একাধিক সদস্য অভিযোগ করেন, টাকা না দেওয়ায় তাঁরা ডিউটি পাননি। এসব অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে কয়েকজন সদস্য ও দলনেতা বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।নতুন পর্বে উঠে আসা সনদসংক্রান্ত অভিযোগ এবং নির্ধারিত সদস্যের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তির দায়িত্ব পালনের অভিযোগের সঙ্গে আগের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তবে অভিযোগগুলো একই নিয়োগ ও দায়িত্ব বণ্টন প্রক্রিয়াকে ঘিরে ওঠায় সামগ্রিকভাবে তদন্তের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।রানী মণ্ডলের ডিউটি পাওয়া এবং তাঁর প্রশিক্ষণ সনদ নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা তাহমিনা খাতুনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, রানী মণ্ডল তাঁর বাসার কাজের লোক হওয়ার পাশাপাশি একজন আনসার সদস্য। অর্থের বিনিময়ে ডিউটি দেওয়া এবং ভুয়া সনদের মাধ্যমে দায়িত্ব পাওয়ার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।